মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪৬ পিএম

ইসরায়েলি বসতিতে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেবে যুক্তরাজ্য

আন্তর্জাতিক
Sub Editor
ইসরায়েলি বসতিতে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেবে যুক্তরাজ্য
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর কাঁদানে গ্যাস থেকে দৌড়ে পালাচ্ছেন ফিলিস্তিনি ভূমিমালিক, সাংবাদিক ও বিক্ষোভকারীরা। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

ইসরায়েলি ‘সন্ত্রাসীরা’ সরকারের নীরব সমর্থনে পশ্চিম তীরে জাতিগত নিধন চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কঠোর নিন্দা। মিলিব্যান্ড জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে সম্পূর্ণভাবে অবৈধ হিসেবে এখন থেকে সরকারি অবস্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেবে যুক্তরাজ্য।

তিনি বলেন, এমন স্বীকৃতি ‘এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ভোগের শিকার মানুষের ন্যূনতম প্রাপ্য। আর এটি ন্যায়বিচারের পথে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত।’

মিলিব্যান্ড জানান, যুক্তরাজ্য এখন কয়েকটি পদক্ষেপ নেবে। এগুলো হলো—

অধিকৃত অঞ্চলে অবস্থিত অবৈধ ইসরায়েলি বসতি থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করা।
ইসরায়েলি বসতিতে নির্মাণকাজ বা অর্থায়নের মতো সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
যুক্তরাজ্যে অবৈধ বসতিতে থাকা সম্পত্তির বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা।
বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতায় উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
দখলদারিত্বে সরাসরি সহায়তা করে এমন অস্ত্রের লাইসেন্স ও অন্যান্য রপ্তানি অনুমোদন বন্ধ করা।

যুক্তরাজ্যসহ ১২টি দেশ মঙ্গলবার পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। অন্য দেশগুলো হলো—কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেন।

মিলিব্যান্ড বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রমাণ হবে যে ‘গভীর অন্যায়ের মুখে ব্রিটেন নীরব নয় এবং অসহায়ও নয়।’

আবেগঘন বক্তব্যে তিনি পশ্চিম তীরে বাড়িঘর ধ্বংসের শিকার ফিলিস্তিনিদের এবং গাজায় চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা শিশুদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখা চিকিৎসকদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।

ইসরায়েলের জেরুজালেমের পূর্বদিকে ‘E1’ বসতি প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কারণে যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

মিলিব্যান্ড বলেন, যারা অবৈধ ইসরায়েলি বসতিতে অর্থায়ন বা সহযোগিতা করবে, তাদের যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার ‘পূর্ণ শক্তি’ মোকাবিলা করতে হবে। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও অন্যান্য ব্যবস্থা কার্যকর করার আইন আগামী নয় মাসের মধ্যে কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করতে রাজি হননি মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করবে না যুক্তরাজ্য।

মঙ্গলবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বক্তব্য দেওয়ার সময় মিলিব্যান্ড বলেন, ‘ব্রিটিশ সরকার একমত যে পশ্চিম তীরের কিছু এলাকায় বসতি স্থাপনকারী সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন চলছে।’

তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলি সরকার অনেক সময় এ বিষয়ে চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এর চেয়েও খারাপ হলো, সরকারের কিছু সদস্য ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য ও পদক্ষেপ নিয়েছেন।’

মিলিব্যান্ড জানান, এর আগে যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতিগুলোকে অবৈধ বললেও ইসরায়েলের পুরো দখলদারিত্বকে অবৈধ হিসেবে ঘোষণা করেনি। এখন সেই অবস্থানের পরিবর্তন হবে।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন ‘গর্বিত ব্রিটিশ ইহুদি’ হিসেবেও তিনি এই পদক্ষেপ নিচ্ছেন। হলোকাস্টের পর তার পরিবারের সদস্যরা ইসরায়েলে নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

মিলিব্যান্ড বলেন, ‘আমি আমার ইহুদি পরিচয় নিয়ে গর্বিত এবং ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতি আমার সমর্থন অটুট।’

তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থনের কোনো বিরোধ নেই। বরং তার মতে, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের মূল ভিত্তিই হলো—উভয় জনগোষ্ঠী স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করবে।

বিশ্বজুড়ে ইহুদিদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য লেবাননের হিজবুল্লাহর অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘আল-কারদ আল-হাসান’-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইরানের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হবে বলে জানান তিনি।

মিলিব্যান্ড বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখের সামনে ফিলিস্তিনে যা ঘটেছে, তা নিয়ে আমি গভীর লজ্জাবোধ করছি।’ গত তিন বছরে ‘অকল্পনীয় মাত্রার মৃত্যু, ধ্বংস ও অমানবিকতার’ মধ্য দিয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের বিষয়ে এটি যুক্তরাজ্যের নতুন নীতির সূচনা। শুধু নিন্দা জানানো নয়, এবার কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের বিরোধ ইসরায়েলের জনগণের সঙ্গে নয়। তাদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক অটুট। আমাদের আপত্তি তাদের সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে।’

মিলিব্যান্ড আরও জানান, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডের কারণে গত চার বছরে যতগুলো নতুন বসতি অনুমোদন করা হয়েছে, তা আগের ২০ বছরে অনুমোদিত বসতির মোট সংখ্যার চেয়েও বেশি।

তিনি বলেন, অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে ব্রিটিশ জনগণের অধিকাংশই সমর্থন করবে বলে তিনি মনে করেন। ‘বসতিগুলো অবৈধ। আমাদের দেশে এগুলোর প্রচার করা উচিত নয়,’ বলেন তিনি।

ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি নিয়েও যুক্তরাজ্য সরকারের উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান মিলিব্যান্ড। গাজায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর ব্যবহারের জন্য আগে থেকেই ৩০টির বেশি অস্ত্র লাইসেন্স স্থগিত করেছে যুক্তরাজ্য। এবার আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘দখলদারিত্বে সরাসরি অবদান রাখে এমন অস্ত্র ও অন্যান্য পণ্যের সব নতুন লাইসেন্স আবেদন আমরা প্রত্যাখ্যান করব। কার্যত অস্ত্র বিক্রির ওপর এটি হবে দ্বৈত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। দখলদারিত্ব যতদিন থাকবে, এসব রপ্তানির নিষেধাজ্ঞাও ততদিন বহাল থাকবে।’

ইসরায়েল গণহত্যা করেছে কি না, তা নির্ধারণে ‘পূর্ণাঙ্গ, কঠোর ও ন্যায্য বিচারিক প্রক্রিয়াকে’ যুক্তরাজ্য সমর্থন করবে বলেও জানান মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, সরকার আগে থেকেই এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে না।

তার ভাষায়, ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশনের পর রুয়ান্ডা, স্রেব্রেনিৎসা, কম্বোডিয়া এবং ইয়াজিদিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়াকে যুক্তরাজ্য সমর্থন করে এবং আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান করবে।

তবে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার ‘ক্রমবর্ধমান প্রমাণ’ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি। এসব অভিযোগের আইনি প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও নির্ধারণকে যুক্তরাজ্য সমর্থন করবে।

আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনে চলমান পরিস্থিতি এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ‘সবচেয়ে স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান’ তুলে ধরবে বলেও জানান মিলিব্যান্ড।

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বক্তব্যে তিনি স্বীকার করেন, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবৈধ ঘোষণা করতে যুক্তরাজ্যের আরও আগে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল।

অন্যদিকে, ছায়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম টুগেনহাট বলেন, ‘অবৈধ বসতি ভুল।’ তবে তার অভিযোগ, পররাষ্ট্র দপ্তর জানে যে মিলিব্যান্ডের নীতিগুলো কার্যকর হবে না, বরং এতে নিরপরাধ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, পশ্চিম তীরে কর্মরত ফিলিস্তিনিরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। কারণ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের অর্থনীতি এতটাই পরস্পরনির্ভর যে অবৈধ বসতি থেকে পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা কঠিন হতে পারে।

তবে কনজারভেটিভ পার্টির প্রবীণ এমপি এডওয়ার্ড লি নিষেধাজ্ঞার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘কনজারভেটিভ ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘদিনের সদস্য হিসেবে আমি গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, আজ তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, আমি তা পুরোপুরি সমর্থন করি। কারণ এটি বিশ্বের সব মানুষের স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর বিষয়।’ 

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।