নতুন করে হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ও কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব মিত্র রয়েছে, তাদেরও সংঘাতের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
রোববার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হুমকি দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান সমঝোতায় না এলে দেশটির অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে কিংবা এর নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।
তবে একই সময়ে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের আসার কথা থাকায় তার সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প।
ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদক জানান, ট্রাম্প বলেছেন—ইরানকে হয় চুক্তিতে আসতে হবে, নয়তো অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হতে হবে অথবা দেশটির নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
চলমান সংঘাতের শুরু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর। এরপর থেকে ট্রাম্প একাধিকবার বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিলেও এখন পর্যন্ত সেসব হুমকির বাস্তবায়ন হয়নি।
এর মধ্যেই ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, দেশটির ওপর নতুন কোনো হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি পাল্টা হামলা চালানো হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোকেও সংঘাতের পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে সতর্ক করেছে তারা।
ইরানি সামরিক বাহিনী আরও জানিয়েছে, তাদের কাছে নতুন হামলার প্রস্তুতির বিষয়ে তথ্য রয়েছে। তবে কী ধরনের তথ্যের ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
রিয়াদে হুতিদের হামলা
এদিকে চলমান সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। শনিবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এর আগে চলতি মাসের শুরুতে ইয়েমেনে আবারও শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে হুতিরা সামরিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করে। এরপর সৌদি রাজধানীতে তাদের হামলার ঘটনা নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
রয়টার্সের ভিডিওতে রিয়াদের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশ থেকে রাতের বেলায় বিস্ফোরণের শব্দের পর বিপুল পরিমাণ কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।
হুতিদের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে মার্কিন নাগরিকদের আরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য ফ্লাইট বাতিল ও আকাশসীমা বন্ধের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
সৌদি আরব এ ঘটনায় সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি। তবে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, দেশটির বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি হামলার চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে।
হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতির কারণে সৌদি আরবও কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। ইয়েমেনে হুতিদের আরও ভূখণ্ড দখল ঠেকাতে বিমান হামলা চালিয়ে যাওয়া, নাকি হামলার ঝুঁকি কমাতে সামরিক অভিযান সীমিত করা—এ নিয়ে দেশটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
জ্বালানি রপ্তানিতে বড় চাপ
ইয়েমেনের উপকূলীয় এলাকায় হুতিদের অগ্রগতির ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই জলপথ দিয়ে লোহিত সাগর ও এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অধিকাংশ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানিও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক বাজারে তেলের সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দামের ওপর চাপ বাড়ছে।
এদিকে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ দেশটির নিজস্ব তেল বিক্রিতেও বাধা সৃষ্টি করছে। এতে ইরানের অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়লেও জুনে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ফিরে যাওয়ার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। চুক্তির শর্ত নিয়ে মতবিরোধের কারণে জুলাইয়ে ওই সমঝোতা ভেঙে যায়।
রোববার ইরান আবারও জানায়, জুনের চুক্তির শর্তগুলো তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পূরণ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে না।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ বলেছেন, শত্রুদের মোকাবিলা করে অর্জনগুলো ধরে রাখতে ইরানকে একই সঙ্গে লড়াই ও কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।