গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বাড়ছে চাপ। সম্প্রতি ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানায় ক্রয়াদেশ কমেছে অথবা বাতিল হয়েছে। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানাকে উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে রপ্তানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। উৎপাদনে বিলম্বের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে পারছে না। আবার সময় ধরে রাখতে কেউ কেউ অতিরিক্ত খরচে বিমানে পণ্য পাঠাচ্ছে, অন্যদিকে কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের ধরে রাখতে কম দামে পণ্য সরবরাহ করছে।
তবে সংকটের মধ্যেও সব কারখানার পরিস্থিতি একই রকম নয়। ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের সরবরাহকারী ফোর এ ইয়ার্ন ডায়িংয়ে বর্তমানে স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন চলছে। সেখানে শ্রমিকেরা হুডি তৈরি ও পোশাকে ব্র্যান্ডের লোগো সংযুক্ত করার কাজ করছেন।
এর অন্যতম কারণ, প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯ সাল থেকেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করে আসছে। পাশাপাশি তারা সৌরবিদ্যুৎও ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে এ ধরনের বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এখনো খুব বেশি দেখা যায় না।
চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাস, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতায় দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
ঢাকার উপকণ্ঠে টিম গ্রুপের একটি কারখানায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিষ্ঠানটির বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণ হয়। বাকি বড় অংশের জন্য তারা নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থা ব্যবহার করে।
টিম গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার আবদুল্লাহ হিল নকীব বলেন, বিদ্যুতের জন্য তারা কখনো একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করেননি। বিকল্প ব্যবস্থা রাখার কারণে কিছুটা নিরাপত্তা পাওয়া গেলেও এতে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। তার ভাষ্য, প্রথমে তেলের সংকট দেখা দেয়, পরে গ্যাসের সমস্যাও শুরু হয়।
নকীব জানান, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ফলে ফোর এ-এর উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়েছে। শুধু জ্বালানি বাবদ প্রতি মাসে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।
এর মধ্যেই সোমবার বাংলাদেশে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় জ্বালানির দাম সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থার উদ্যোগ
ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ফোর এ নতুন পরিকল্পনাও করছে। প্রতিষ্ঠানটি শিল্পকারখানায় ব্যবহারের উপযোগী বড় ব্যাটারি স্থাপনের কথা জানিয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুতের অন্য উৎসে সমস্যা দেখা দিলেও কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নকীব বলেন, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ের চাপ প্রতিষ্ঠানটি সামলাতে পারলেও সব পোশাক কারখানার পক্ষে একইভাবে তা বহন করা সম্ভব নয়। তার কারখানার ছাদের বড় অংশজুড়েই সৌর প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম বাড়ায় বাড়ছে উদ্বেগ
গ্যাস আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতেও প্রভাব ফেলছে। গ্যাসের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। পাশাপাশি গ্যাসে ভর্তুকির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের উন্নয়নমূলক ব্যয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে বলে গত সপ্তাহে বাংলাদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী জানিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্পের গুরুত্বও অনেক বেশি। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং দেশের জিডিপিতে খাতটির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের জন্য কেউ কেউ বিমানপথে চালান পাঠাচ্ছেন। আবার ক্রেতাদের ধরে রাখতে কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড় দিয়ে পণ্য বিক্রি করছে।
পোশাক রপ্তানিকারক শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, পোশাক খাতে মুনাফার হার এমনিতেই কম। জ্বালানির দাম বাড়ায় সেই মুনাফা আরও কমে যাবে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি জানান, কানাডার একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান শুরুতে বাংলাদেশ থেকে ২৫ হাজার পোশাক নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। পরে সেই পরিমাণ কমিয়ে ৮ হাজারে নামিয়ে আনে। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
অন্যদিকে ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় হয়তো অনেক প্রতিষ্ঠান সামলাতে পারবে। তবে গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে এ ধরনের সমস্যা তুলনামূলক কম।
এইচঅ্যান্ডএমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করে ডেনিম এক্সপার্ট। মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।