যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে জিনের কার্যক্রমের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করেছেন। গবেষকদের দাবি, এই কাজ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ বোঝার পাশাপাশি আলঝেইমার, পারকিনসন ও সিজোফ্রেনিয়ার মতো গুরুতর রোগের পেছনে থাকা জৈবিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন তথ্য দিয়েছে।
বুধবার Natureসহ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত নয়টি গবেষণায় মস্তিষ্কের বিভিন্ন ধরনের কোষে সময়ের সঙ্গে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব তথ্য ভবিষ্যতে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি ও সম্ভাব্য চিকিৎসা লক্ষ্যমাত্রা শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মস্তিষ্কের সামনের অংশে, কপালের ঠিক পেছনে অবস্থিত। পরিকল্পনা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আচরণ পরিবর্তনের মতো উচ্চস্তরের কাজের সঙ্গে এ অংশটি যুক্ত। বয়স বাড়ার সঙ্গে এ অঞ্চলে পরিবর্তন দেখা যায় এবং বিভিন্ন মানসিক ও স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগেও এর কার্যক্রম প্রভাবিত হয়।
গবেষণায় ১ হাজার ৪৯৪ জন মৃত ব্যক্তির মস্তিষ্ক থেকে সংগৃহীত ৬৩ লাখের বেশি কোষের নিউক্লিয়াসে জিনের কার্যক্রম পরীক্ষা করা হয়েছে। দাতাদের বয়স ছিল শৈশব থেকে শুরু করে ১০৮ বছর পর্যন্ত এবং তাদের বিভিন্ন জেনেটিক বংশগতির প্রতিনিধিত্ব ছিল।
গবেষণায় সুস্থ ব্যক্তি ছাড়াও আলঝেইমার, পারকিনসন, লুই বডি ডিমেনশিয়া, ভাসকুলার ডিমেনশিয়া, সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের নমুনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণার অন্যতম নেতা এবং নিউইয়র্কের আইকান স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাইয়ের সেন্টার ফর ডিজিজ নিউরোজেনোমিক্সের পরিচালক ড. প্যানোস রুসোস বলেন, এসব গবেষণা রোগের কারণে মস্তিষ্কের কোথায় পরিবর্তন ঘটে এবং কোন জৈবিক প্রক্রিয়াগুলো আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা দরকার, সে বিষয়ে ধারণা দিয়েছে।
রোগগুলোর মধ্যে মিল
গবেষণায় আলঝেইমার, লুই বডি রোগ, ভাসকুলার ডিমেনশিয়া ও পারকিনসনের মধ্যে জিনের কার্যক্রমে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মিল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে স্নায়ুকোষের বিকাশ, কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ এবং মস্তিষ্কের রক্তনালির সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক কার্যক্রমে মিল দেখা গেছে।
আলঝেইমার ও পারকিনসনের ক্ষেত্রে মাইক্রোগ্লিয়া নামের মস্তিষ্কের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধী কোষের মধ্যেও কিছু অভিন্ন জৈবিক পথ শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা।
বিভিন্ন বয়সের মানুষের মস্তিষ্কের নমুনা তুলনা করে দেখা যায়, শৈশব থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময় পর্যন্ত জিনগত ও আণবিক পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এরপর প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বড় একটি সময় এসব পরিবর্তন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। পরে বয়স বাড়ার সঙ্গে আবার পরিবর্তন বাড়ে, বিশেষ করে রোগপ্রতিরোধী ও সহায়ক কোষগুলোতে।
গবেষকেরা প্রায় ২৪ বছর বয়সকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ সময়ের পর ওই মস্তিষ্ক অঞ্চলের অধিকাংশ কোষের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হয়ে আসে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ২৪ বছর বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ সম্পূর্ণ হয়ে যায় বা এরপর থেকেই মস্তিষ্কের ক্ষয় শুরু হয়।
আলঝেইমারে ‘সুরক্ষামূলক’ প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত
গবেষণায় মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতা এবং আলঝেইমারের সঙ্গে থাকা বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু কোষগত বৈশিষ্ট্যও পাওয়া গেছে।
যেসব ব্যক্তির মস্তিষ্কে আলঝেইমারের উল্লেখযোগ্য মাত্রার ক্ষত বা রোগগত পরিবর্তন থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানীয় সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল, তাদের মস্তিষ্কের কোষে শক্তি উৎপাদনসংক্রান্ত কিছু প্রক্রিয়ায় পার্থক্য দেখা গেছে।
গবেষকদের ধারণা, এসব বৈশিষ্ট্য মস্তিষ্ককে রোগের ক্ষতি থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়ার সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
বংশগত ঝুঁকি ও দৈনিক জৈবিক ছন্দ
গবেষকেরা বিভিন্ন রোগের বংশগত ঝুঁকির সঙ্গে নির্দিষ্ট জিন ও মস্তিষ্কের কোষের সম্পর্কও খুঁজে দেখেছেন। এ সময় ১৪ হাজারের বেশি জিনের কার্যক্রমে জেনেটিক প্রভাবের মানচিত্র তৈরি করা হয়।
এ ছাড়া দিনের বিভিন্ন সময়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের নমুনা বিশ্লেষণ করে জিনের কার্যক্রমের দৈনিক ছন্দও পুনর্গঠন করা হয়েছে। তরুণ ও মধ্যবয়সী মানুষের মস্তিষ্কে দৈনিক জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগুলো স্নায়ুকোষে সমন্বিতভাবে কাজ করতে দেখা যায়। তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই সমন্বয় তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে মস্তিষ্কে দৈনিক জৈবিক ছন্দের সংগঠনও পরিবর্তিত হয়। এই ছন্দ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারলে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কি না, তা ভবিষ্যৎ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
গবেষকেরা আলঝেইমারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য পৃথক আণবিক প্রোফাইলও তৈরি করেছেন। এতে একই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও জিনের নিয়ন্ত্রণ ও বিভিন্ন ধরনের কোষের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে বলে দেখা গেছে।
গবেষকদের মতে, এই বৈচিত্র্য বোঝা গেলে একই রোগের ক্ষেত্রে কেন মানুষের মস্তিষ্কে ভিন্ন ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়, তা ব্যাখ্যা করা সহজ হতে পারে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যক্তিভেদে আলাদা চিকিৎসা কৌশল তৈরির গবেষণার ভিত্তিও তৈরি হবে।