মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম

নামের মিলে ১০ মাস কারাগারে, হাইকোর্টে আলমাছ

সারাদেশ
Sub Editor
নামের মিলে ১০ মাস কারাগারে, হাইকোর্টে আলমাছ
নামের মিলের কারণে সাজাপ্রাপ্ত আসামির পরিবর্তে কারাগারে থাকা মো. আলমাছ।-ছবি: সংগৃহীত

একই নাম, বাবার নামেও রয়েছে আংশিক মিল। আর এই নামের মিলের কারণেই অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য একজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখার অভিযোগ উঠেছে।

প্রায় ২২ বছর আগে দেওয়া ওই মামলার রায়ের পর গ্রেপ্তার হওয়া আলমাছ ১০ মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন। তাঁর দাবি, তিনি মামলার প্রকৃত আসামি নন।

বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হলে হাইকোর্ট কারাগারে থাকা আলমাছ এবং ২০০৪ সালে সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাই করতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

নথি অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে মো. আলমাছ ও মো. নাজমুল আলম মামুনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। মামলাটির বিচার শেষে ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। অপর আসামি নাজমুল খালাস পান।

রায়ে সাজাপ্রাপ্ত আলমাছের বাবার নাম মো. খলিল আহমেদ এবং ঠিকানা দক্ষিণ বাহ্রা, দোহার, ঢাকা উল্লেখ করা হয়। তাঁর বর্তমান ঠিকানা হিসেবে আহমেদনগর, পাইকপাড়া, মিরপুরের কথা বলা হয়েছিল। রায় ঘোষণার সময় তিনি পলাতক ছিলেন। পরে তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি হয়।

অন্যদিকে বর্তমানে কারাগারে থাকা আলমাছের বাবার নাম শেখ খলিল এবং বাড়ি দোহারের সুন্দরীপাড়ায়। তাঁর দাবি, নামের মিলের কারণে পুলিশ তাঁকে প্রকৃত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার করেছে।

আগেও একই মামলায় আটক হয়েছিলেন

রিট আবেদনে কারাগারে থাকা আলমাছ জানিয়েছেন, ২০১৮ সালেও একই মামলায় তাঁকে আটক করা হয়েছিল। পরে জিম্মানামার মাধ্যমে তিনি মুক্তি পান।

তখন স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তাঁকে বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, মামলার আসামির নাম ও ঠিকানায় ভুল থাকায় তাঁকে জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

ওই সময় কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের দেওয়া একটি প্রত্যয়নপত্রেও বলা হয়, সাজাপ্রাপ্ত আলমাছ স্থানীয় বাসিন্দা নন। তিনি প্রায় ২৫ বছর আগে বাড়িঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে শেখ খলিলের ছেলে আলমাছকে মামলার প্রকৃত আসামি নয় বলেও প্রত্যয়ন করা হয়।

পরোয়ানার পর আবার গ্রেপ্তার

রিটের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২০ মার্চ জারি হওয়া পরোয়ানার ভিত্তিতে গত বছরের ৫ নভেম্বর কারাগারে থাকা আলমাছকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দোহারের বাহ্রায় বসবাসের সময় তাঁর বিরুদ্ধে মামলাটি হয়েছিল। ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে নদীভাঙনে তাঁর বাড়িঘর বিলীন হয়ে যায়। এরপর পরিবার নিয়ে সুন্দরীপাড়া এলাকায় বসতি স্থাপন করেন তিনি।

তবে স্থানীয় তদন্ত ও বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে, দক্ষিণ বাহ্রায় শেখ খলিল ওরফে খলিল আহমেদের ছেলে আলমাছ ছাড়া একই নামে অন্য কোনো ব্যক্তি বসবাস করতেন না।

বয়সের হিসাবেও গরমিল

হাইকোর্টে করা রিটে আলমাছ দাবি করেছেন, ২০০৪ সালের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি তিনি নন। তাঁর জন্ম ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। সে হিসাবে ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মামলা হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর ৪ মাস।

কিন্তু মামলার এজাহারে আসামি আলমাছের বয়স ২৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছিল। এ কারণে রিটকারী দাবি করেছেন, নথিতে থাকা বয়সের সঙ্গে তাঁর বয়সের বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে এবং তিনি মামলার সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন।

রিটে অবিলম্বে মুক্তি, পরিচয় নিশ্চিত করতে স্বাধীন তদন্ত এবং ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দাবি করা হয়েছে, ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে রাখা বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী।

পরিচয় যাচাইয়ে হাইকোর্টের নির্দেশ

রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেন। আদালত কারাগারে থাকা আলমাছ এবং ২০০৪ সালের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাই করতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তদন্তে সহযোগিতা করতে দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপারকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালত ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন। পাশাপাশি রুলে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে রিট আবেদনকারীকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে রাখা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া তাঁকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, রুলে সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে। পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ৫ নভেম্বর মামলাটি কার্যতালিকায় আসার কথা রয়েছে।

কারাগারে থাকা আলমাছের আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ বলেন, কাউকে গ্রেপ্তারের আগে তাঁর নাম, ঠিকানা ও পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করা সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়ায় ঘাটতি ছিল। একই ধরনের ঘটনা ঠেকাতে আসামির পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। 

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।