মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনের অনুমতি দিতে কি ইরান টোল আদায় করছে?

আন্তর্জাতিক
Sub Editor
হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহনের অনুমতি দিতে কি ইরান টোল আদায় করছে?
হরমুজ প্রণালির কাছে ওমানের মুসান্দাম উপকূলে নোঙর করা জাহাজ, ২ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: আল জাজিরা

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে যে মাত্রায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি হতো, তা আবারও ছাড়িয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালি অবরোধ এবং জাহাজে হামলার জন্য তেহরানের বিভিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহের চার দিনে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ওই সময় প্রতিদিন ১ কোটি ৯৫ লাখ থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল রপ্তানি হয়েছে। যুদ্ধের আগে দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়ার পেছনে এখন পর্যন্ত অন্যতম কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচলে মার্কিন জাহাজের নিরাপত্তা সহায়তা এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে এসেছে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি কিছুটা কমছে।

তবে তেলের দাম এখনও তুলনামূলক বেশি থাকার পেছনে বিশ্লেষকেরা ইরানের হামলার আশঙ্কায় উচ্চ বীমা ব্যয় এবং ফের যুদ্ধ তীব্র হওয়ার সম্ভাবনাকে দায়ী করছেন।

কেপলারের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিশেল ব্রোহার্ড অবশ্য তেল রপ্তানি বাড়ার ভিন্ন একটি কারণের কথা বলেছেন। তার ধারণা, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পার করার বিনিময়ে ইরানকে অর্থ দিতে পারে। এর ফলে তেলবাহী জাহাজের পণ্যের মূল্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তেহরানের হাতে যেতে পারে।

যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

কেপলারের বিশ্লেষক কী বলেছেন?

কেপলারের নীতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিভাগের প্রধান মিশেল ব্রোহার্ড সম্প্রতি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের অনুমতির বিনিময়ে কিছু দেশ ইরানকে অর্থ দিতে পারে।

তিনি ধারণা করছেন, নিরাপদে জাহাজ চলাচলের জন্য কোনো ধরনের ‘টোল’ দেওয়া হচ্ছে। তবে মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তার ওপর নির্ভরতা এবং ইরানকে পণ্যের ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, যুদ্ধ আবার শুরু হওয়ার আগে যত দ্রুত সম্ভব বেশি পরিমাণ তেল রপ্তানি করে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে এই দাবির স্বাধীন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব্রোহার্ড নিজেও এটিকে নিশ্চিত তথ্য নয়, বরং একটি ধারণা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

এর আগে মার্চে শিপিং জার্নাল লয়েডস লিস্ট জানিয়েছিল, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে একটি ‘টোল বুথ’ ব্যবস্থা চালু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনও যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে বলে এসেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো চুক্তির আওতায় ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য টোল নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।

প্রণালিটি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিভিন্ন দেশের কৃষিখাতও চাপের মুখে পড়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে এখন কী হচ্ছে?

সামুদ্রিক পরিবহন পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি ক্রমেই বাড়ছে।

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে সাত দিনের গড় তেল রপ্তানি দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেলের যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটি ছিল প্রথমবারের মতো এমন ঘটনা।

কেপলারের হিসাবে, ইরান বাদে সেপ্টেম্বর মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের গড় রপ্তানিও অন্তত দৈনিক ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।

অক্টোবরেও রপ্তানি বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। ইরাকের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অয়েল ট্যাংকার কোম্পানি শনিবার জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে একটি বড় তেলবাহী জাহাজে ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক বলেছেন, কয়েক দশকের মধ্যে এটিই ছিল এ ধরনের প্রথম কার্যক্রম।

কেপলার জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাচ্ছে এবং প্রণালি অতিক্রম করা বেশিরভাগ অপরিশোধিত তেল সমুদ্রে অন্য ট্যাংকারে স্থানান্তর করা হচ্ছে। এর বড় অংশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাইপলাইন দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে।

এ ছাড়া রপ্তানির পরিসংখ্যানে লোহিত সাগর দিয়ে পরিবহন করা তেলও রয়েছে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরের গুরুত্ব বাড়ছে।

তবে কেপলারের তথ্যের মধ্যে এমন কিছু জাহাজ নেই, যেগুলো শনাক্ত হওয়া এড়াতে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (এআইএস) বন্ধ রেখে হরমুজ প্রণালি পার হয়ে থাকতে পারে।

ইরান অবশ্য দাবি করছে, জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তারা হারায়নি। আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কমান্ডার আলী ফাদাভি রোববার বলেন, মাত্র ৩০ থেকে ৪০ লাখ ব্যারেল তেল মার্কিন তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি রুট দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের আগের তুলনায় এই পরিমাণকে তিনি ‘নগণ্য’ বলে উল্লেখ করেন।

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১২৫টি বড় বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। এর মধ্যে তেলবাহী ট্যাংকার, গ্যাসবাহী জাহাজ, বাল্ক ক্যারিয়ার ও কনটেইনার জাহাজ ছিল।

তেলের দাম এখন কত?

মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য কমেছে। গত সপ্তাহে জি৭ দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার সিদ্ধান্তও নেয়।

তবে যুদ্ধের আগের তুলনায় অপরিশোধিত তেলের দাম এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০১ দশমিক ৫৯ ডলার, যা ০.৭১ শতাংশ কম। অন্যদিকে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১.২ শতাংশ কমে প্রায় ৯০ দশমিক ০৫ ডলারে দাঁড়ায়।

ওয়েলথ ক্লাবের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ সুসানাহ স্ট্রিটার বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।

তার মতে, হরমুজ প্রণালি এখনও বড় ধরনের উত্তেজনার কেন্দ্র। রোববার আরেকটি ট্যাংকারে হামলার ঘটনা সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

সোমবার যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া একটি তেলবাহী জাহাজকে আইআরজিসি ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে। তা না হলে জাহাজটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।

ইরানের টোল নেওয়ার দাবির ভিত্তি কতটা?

লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটির মেরিটাইম সেন্টারের প্রধান আবদুল খালিক বলেন, কেপলারের বিশ্লেষক ব্রোহার্ডের ধারণাটি ‘সম্ভব’ হলেও এটিকে আনুষ্ঠানিক টোল ব্যবস্থার বদলে অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা ভালো।

তিনি বলেন, ইরান নিয়মিতভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে টোল আদায় করছে—এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ নেই। জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন (UNCLOS) আন্তর্জাতিক প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করে, ফলে আনুষ্ঠানিক টোল আদায়ের বিষয়টি আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।

আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প বলেন, ব্রোহার্ডের ধারণাটি আংশিকভাবে সম্ভব হতে পারে।

তবে তার মতে, তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জাহাজ চলাচল।

তিনি বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে ট্যাংকার এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে তেল স্থানান্তরের ব্যবস্থা তেল রপ্তানিতে সহায়তা করছে। তবে এর জন্য বিপুল সংখ্যক জাহাজ প্রয়োজন হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও জাহাজের সরবরাহ কমেছে।

এশিয়ার ক্রেতাদেরও দূরবর্তী উৎস থেকে অপরিশোধিত তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে পরিবহনের সময় বাড়ছে।

বিশ্লেষক বিউচ্যাম্প বলেন, বিষয়টি এখন শুধু তেল সরবরাহের নয়; বরং জাহাজ চলাচলের বাস্তব ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত। আর নতুন জাহাজ রাতারাতি তৈরি করা সম্ভব নয়। 

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।