মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ০৮:১১ এএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ০৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম

গণহত্যা চালালেই ইসরায়েলের জয় নিশ্চিত হয় না

আন্তর্জাতিক
Sub Editor
গণহত্যা চালালেই ইসরায়েলের জয় নিশ্চিত হয় না
গাজার জাবালিয়া শহরের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে আছেন ইসরায়েলি সেনারা। ২২ এপ্রিল ২০২৬, কিবুতজ নির আম, ইসরায়েল। ছবি: আল জাজিরা

হামাসের হামলার তিন বছর পরও গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি ইসরায়েল। বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহার করে উপত্যকাজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ নির্মূল, জিম্মিদের মুক্তি এবং বিকল্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি দেশটি।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অজেয় ভাবমূর্তি বড় ধরনের ধাক্কা খায়। এরপর গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এতে পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থনও পায় দেশটি। অভিযানে সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক জনগণও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। খাদ্যসংকট, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং শিক্ষা ও পানি-বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিতে গাজার মানুষের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

জিম্মি মুক্তি ও হামাস নির্মূলে ব্যর্থতা

যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েল সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল জিম্মিদের মুক্ত করা, ফিলিস্তিনি প্রতিরোধকে নির্মূল করা, গাজার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বিকল্প প্রশাসন গঠন। ফিলিস্তিনিদের উপত্যকা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতির অভিযোগও উঠেছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গাজায় নেওয়া ২৫০ জন জিম্মির মধ্যে ইসরায়েলি সেনারা সরাসরি অভিযান চালিয়ে মাত্র আটজনকে মুক্ত করতে পেরেছে এবং আরও ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। অন্তত তিনজন জিম্মি ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে নিহত হন। অন্যদের একটি অংশের মৃত্যুর বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। অধিকাংশ জিম্মিকে মুক্ত করা হয়েছে হামাসের সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে।

এদিকে ব্যাপক সামরিক অভিযান এবং হামাসের বহু নেতাকে হত্যার পরও গাজায় সংগঠনটির উপস্থিতি পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। উপত্যকার কিছু এলাকায় হামাসের নিয়ন্ত্রণ এখনো রয়েছে। ফলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নিরস্ত্র করার পরিবর্তে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনায় যেতে হয়েছে ইসরায়েলকে।

গাজার নিয়ন্ত্রণ ও বিকল্প প্রশাসন পরিকল্পনায় বাধা

ইসরায়েলি বাহিনী গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা দখলে রেখেছে। তবে বাকি অঞ্চল পুরোপুরি দখলে নিতে বড় ধরনের অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, মানবিক ও সামরিক ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হচ্ছে দেশটিকে।

গাজায় জাতিসংঘকে বাদ দিয়ে বিকল্প প্রশাসন ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগও প্রত্যাশিত অগ্রগতি পায়নি। প্রশাসনিক কমিটি এখনো উপত্যকায় প্রবেশ করে শাসনভার গ্রহণ করতে পারেনি। একই সঙ্গে চুক্তিতে উল্লেখ থাকা মানবিক সহায়তার ব্যবস্থাও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

ফিলিস্তিনিদের গাজা ছাড়তে বাধ্য করার প্রচেষ্টাও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি। বারবার বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং তথাকথিত ‘স্বেচ্ছায় চলে যাওয়ার’ বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যেও অধিকাংশ ফিলিস্তিনি নিজেদের ভূমিতে থাকার অবস্থান জানিয়েছে। এমনকি মিসর থেকে কিছু ফিলিস্তিনি গাজায় ফিরেও এসেছেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চাপে ইসরায়েল

গাজায় সামরিক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম হলেও যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিজেদের পক্ষে গড়ে তুলতে পারেনি ইসরায়েল। বরং ফিলিস্তিনিদের অব্যাহত উপস্থিতি, প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রশ্নে বাড়তে থাকা সমর্থন ইসরায়েলের কৌশলের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সভাকক্ষ ত্যাগ করার ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর অবস্থান নিয়ে প্রশ্নের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে।

পিউ রিসার্চের ৩৬টি দেশের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারীদের ৬৭ শতাংশের ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ হার ৬০ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৩, যুক্তরাজ্যে ৬৯ এবং ফ্রান্সে ৬৮ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা কমানো বা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশেও অবৈধ ইসরায়েলি বসতির সঙ্গে বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সামরিক শক্তি দিয়ে মানুষ হত্যা, ঘরবাড়ি ধ্বংস কিংবা কোনো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘদিনের জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষা মুছে ফেলা যায় না। গাজায় তিন বছরের যুদ্ধের পরও ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ভূমিতে থাকার সংকল্প এবং তাদের অধিকারের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। 

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।