ইরানের কর্তৃপক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় আরব দেশগুলোর পরিচালিত তেল পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি রপ্তানি বাড়াতে এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল থাকা এবং নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়ার প্রেক্ষাপটে তেহরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নিজেদের শর্ত মানতে ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করবে তারা।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ইরানের পাল্টা হামলার কারণে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল অনেকাংশে বন্ধ হয়ে যায়।
তবে জ্বালানি সংকটের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে তেলসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানির সুযোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী একটি বিকল্প নৌপথ চালু করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
রোববার রাতে ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজায়ি বলেন, এই পরিবহনব্যবস্থা এখন তেহরানের সরাসরি লক্ষ্যবস্তু।
রেজায়ির দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ছোট জাহাজ ব্যবহার করে বড় তেলবাহী ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে এই ব্যবস্থায় অংশ নেওয়া পাঁচ থেকে ছয়টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করেন তিনি।
রেজায়ি বলেন, ‘আপনারা চোরাচালান করছেন, কিন্তু প্রণালিটি ইরানের নিয়ন্ত্রণে এবং আমরাই এটি পরিচালনা করি।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জ্বালানি রপ্তানি যুদ্ধের আগের পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা তুলে ধরেছেন। রেজায়ির বক্তব্যকে ট্রাম্পের প্রতি একধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, হরমুজ প্রণালির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় ইরান। একই সঙ্গে দেশটির জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোতে আবার হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
আরব অঞ্চলের দেশগুলোর প্রতিও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন রেজায়ি। তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেবল নেটওয়ার্ক, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) স্থাপনায় হামলার হুমকি দিয়েছেন।
এ ছাড়া ইরানের বিধিনিষেধ এড়িয়ে তেল পরিবহনে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করার জন্য সৌদি আরবকে অভিযুক্ত করেছেন তিনি। তবে রিয়াদে সরাসরি হামলার হুমকি দেননি রেজায়ি। বর্তমানে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের হামলার লক্ষ্যবস্তু সৌদি আরব।
এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনের বন্দর এবং নোঙরস্থলে থাকা ট্যাংকারগুলোকে হুমকি দিয়েছিল। ইরানের ট্যাংকারে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়ায় এ হুমকি দেওয়া হয়। দেশ দুটিতে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকায় তাদেরও সহযোগিতার জন্য দায়ী করে ইরান।
হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে তেহরানের সাতটি শর্তের কয়েকটি যুক্তরাষ্ট্র মেনে নিয়েছে বলে দাবি করেছে ইরান। তবে দেশটির বক্তব্য, সব শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না।
ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজির মতে, তেহরান মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তাদের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো চাপ নেই। কারণ, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের চাপের প্রভাব বিশ্বজুড়ে পড়ছে।
তবে আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, সংঘাতের কারণে ইরানের নিজের অর্থনীতিতেও ক্রমবর্ধমান ব্যয় তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন চাপ বজায় রাখার সক্ষমতা নিয়ে তেহরান অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী কি না, সেটিই প্রশ্ন।
তেল পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা
এই ব্যবস্থায় অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের (ভিএলসিসি) সঙ্গে ছোট জাহাজ সমন্বয় করে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সহায়তায় আরব দেশগুলোর বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল নিয়ে ওমানের উপকূলসংলগ্ন দক্ষিণের করিডর ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পার হয় জাহাজগুলো।
ইরানের হামলার ঝুঁকি কমাতে জাহাজগুলো প্রায়ই নিজেদের অবস্থান শনাক্ত করার ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখে এবং রাতে চলাচল করে। ওমান উপসাগরে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের পর কিছু ছোট জাহাজ আবার নতুন করে তেল নিতে ফিরে আসে।
রোববার রাত থেকে সোমবারের মধ্যে একাধিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গন্তব্যের দিকে যাত্রা করা দুটি ট্যাংকার এবং ওমানের বন্দরনগরী সোহারসংলগ্ন নোঙরস্থলে থাকা একটি জাহাজ রয়েছে। সেখানে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
গত সপ্তাহেও একাধিক জাহাজে প্রক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলার খবর পাওয়া যায়। এতে ইঙ্গিত মিলছে, হামলা শুধু হরমুজ প্রণালির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিকল্প তেল পরিবহনব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে নৌমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় না করে এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোর জন্য মাইনকে গুরুতর হুমকি হিসেবে তুলে ধরছে আইআরজিসি।
আইআরজিসির দাবি, সপ্তাহান্তে মাইনের আঘাতে তিনটি ট্যাংকার বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে। মাইনের আঘাতে একটি জাহাজে আগুন ধরে যাওয়ার ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। তবে প্রকাশিত ভিডিওতে মাইন বিস্ফোরণের দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।