জলবায়ু বিশেষজ্ঞেরা প্রায় হতাশ কণ্ঠে জানিয়েছেন, উপকূলীয় জনপদ আশাশুনির ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অনিশ্চিত। সাতক্ষীরার এই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটি জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবে আজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে। বিশেষ করে প্রতাপনগর ইউনিয়নের ২৩টি গ্রাম মানচিত্র থেকে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি কেবল ভূখণ্ডের বিলীন হওয়া নয়, বরং মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও গ্রামত্যাগের এক করুণ আখ্যান। সাতক্ষীরায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাগুলোর মধ্যে আশাশুনি অন্যতম। আশাশুনির শিশু–কিশোরদের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম, হারিয়ে যাচ্ছে মানে নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে এমন নয়। ওখানকার মানুষেরা চলে যাচ্ছে অন্য কোথাও। সেখানে কত দিন থাকা যাবে, সেটা কেউ বলতে পারে না। মেয়েরা কেন যশোর যাচ্ছে?—এ প্রশ্নে তামান্না, শাকিব, সুচনা, হালিম পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পেছন থেকে কেউ একজন বলে, ‘ওখানে মেলা তেল। তামান্না বলে, মেয়েরা যায়, আবার ফিরে আসে। অন্য শিশু–কিশোর–কিশোরীরা যখন নিরাপদ পানির সংকট, স্কুলে যাতায়াতের সমস্যা, খোসপাঁচড়া, ডায়রিয়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ইত্যাদি সমস্যার কথা বলে, তখন তামান্না আয়রোজগারের সন্ধানে পরিবারপ্রধানদের দূরদেশে চলে যাওয়াকে বড় সমস্যা বলে। পাড়া বা গ্রামভিত্তিক শিশু–কিশোর দল তারা গড়ে তুলেছে। ২০২১–২০২২ সালে প্রায় ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে যায়। এর একটা কারণ হতে পারে কোভিড–১৯ অতিমারি। তিন–চার বছর আগেও এত শিক্ষার্থী ফেল করত না।
হাওলাদার পাড়ার তামান্না সুলতানা জানায়, সেখানকার মানুষজন স্থায়ীভাবে বসবাসের নিশ্চয়তা হারিয়ে ফেলেছে। ২৩ গ্রামের এক গ্রাম হাওলাদার পাড়ায় থাকেন তামান্না সুলতানা।
পার্শ্ববর্তী হরিশখালী, কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, বনতলা ও দিঘলারাইটের মতো গ্রামগুলো ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ছে। ২০২৩ সালে কেউই ফেল করেনি। ২০২৫ ফেল করেছিল ১৫ জন।
জীবিকার তাগিদে পুরুষেরা পাড়ি জমাচ্ছেন খুলনা, ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামের মতো শহরে।
নারীরা কাজের খোঁজে যশোরে গেলেও পুরুষদের তুলনায় তাদের ফেরার হার বেশি। তামান্নাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিরা চলে যাওয়ায় শিশুরা অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। তারা মনে করছে, বাঘের চেয়েও বড় হুমকি এখন শিশু পাচার ও অসামাজিক কার্যকলাপ, যা অভিবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাঘের চেয়ে দুষ্ট মানুষের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করা বেশি কঠিন।
খুলনায় আয়োজিত জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়া তামান্না ‘বাবুই পাখি’ নামক কমিউনিটি শিশু দলের নেতৃত্বে রয়েছে। তাদের লক্ষ্য স্থানীয় পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা। তামান্না প্রতাপনগরের ইউনাইটেড একাডেমিতে পড়াশোনা করে। তবে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থাও সংকটের মুখে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ৬২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৬ জন উত্তীর্ণ হয়েছে। তথ্য বলছে, অতিমারির পর থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে, যারা ইটভাটায় শ্রমে নিয়োজিত হতে গিয়ে পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাটের শিশুরা খুলনায় একসঙ্গে বসেছিল আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ করতে। জলবায়ু পরিবর্তন তাদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে এবং তা মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে তারা কী উদ্যোগ নিয়েছে—সেসবের হিসাব-নিকাশই ছিল খুলনার এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য।
আইএলওর ২০২৪ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে অধিকাংশ শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেত। সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকা থেকে দালালের মাধ্যমে পরিবারকে অগ্রিম অর্থ দিয়ে শিশুদের কর্মক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা চরম উদ্বেগজনক। অতীতে এই ধরনের জীবনসংগ্রামে জাহিদুল নামে এক শিশুর মর্মান্তিক পরিণতির ঘটনাও সকলের জানা। এছাড়া কিশোরীদের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহই বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৪ সালের ‘বাংলাদেশের ইটভাটায় শিশুশ্রমের স্বাস্থ্যঝুঁকি’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ইটভাটায় কাজে যোগ দেওয়ার আগে শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গ্রামের প্রায় ৮৪ শতাংশ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত। ছেলেরা কার্তিক মাসে ইটভাটায় কাজ করতে চলে যায়; তাদের আর বার্ষিক পরীক্ষা দেওয়া হয় না। সাতক্ষীরার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ইটভাটার মৌসুমে রিজার্ভ বাস যায় কমপক্ষে ১০টি জেলায়।
প্রতাপনগরের কিশোরীদের মতে, তাদের এলাকার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি
- প্রতিটি পাড়ায় নিরাপদ পানির ব্যবস্থা (বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও লবণমুক্ত পানি)
- উঁচু ও জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু স্কুল ও টয়লেট
- শিশুদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার নিরাপদ স্থান
- অপুষ্টি শনাক্তকরণ ও পুষ্টিসহায়তা
- বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ প্রস্তুতি।
শিশুবান্ধব উদ্যোগের একটি সফল উদাহরণ হলো প্রতাপনগরের ভাসমান সেতু। নদীর ভাঙনে সড়ক বিলীন হয়ে যাওয়ায় শিশুরা যাতায়াতে চরম সংকটে পড়েছিল। স্থানীয় কিশোর-কিশোরীদের চাপের মুখে ইউনিয়ন পরিষদ শেষ পর্যন্ত এই ভাসমান সেতুটি নির্মাণ করতে বাধ্য হয়, যা প্রায় ১৪০ জন শিক্ষার্থীর স্কুলে যাতায়াতের পথ সুগম করেছে। তামান্না দৃঢ়ভাবে বলে, তারা কেবল কিশোর দল নয়, বরং একটি ‘কিশোর শক্তি’, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় লড়ে যেতে বদ্ধপরিকর।