ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস— জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নিরঙ্কুশ বিশ্বস্ত এক সিপাহশালা। তিনি একজন পরিচ্ছন্ন, বিচক্ষণ, সৎ ও ডায়নামিক রাজনীতিবিদ। তবে তাঁর পরিচয় কেবল একজন রাজনীতিবিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি একজন মেধাবী আইনজীবীও। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে তিনি অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে আইন পেশায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বৃহত্তম আইনজীবী সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব হিসেবে অর্পিত দায়িত্বও অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন।
একটা সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের রাজনীতি আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ—এই দুই ধারায় বিভক্ত ছিল। এই বিভক্তির কারণে আইনজীবীদের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন আইনজীবী সমিতিতে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থানও ছিল নানা প্রতিকূলতার মুখে। দীর্ঘদিনের এই বিভক্তি আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের জন্য রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে অনেক কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।
ঠিক সেই সময় বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ গঠন করে সদস্য সচিব হিসেবে কঠিন দায়িত্ব যখন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের কাঁধে আসে, তখন তিনি অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। তাঁর নেতৃত্ব ও উদ্যোগে দীর্ঘদিনের বিভক্তি কাটিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে ঐক্যের পরিবেশ তৈরি হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় আইনজীবীদের অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতি চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতিসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষের আইনজীবীদের সাংগঠনিক শক্তি ও নির্বাচনী সাফল্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। দীর্ঘদিনের হারানো অবস্থান ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ঐক্যের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আমি মনে করি, এই ঐক্য প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর মানুষকে বোঝার ক্ষমতা। বয়োজ্যেষ্ঠ ও সিনিয়র আইনজীবীদের প্রতি তাঁর সম্মান, তরুণদের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ও দায়িত্ববোধ, সমসাময়িক আইনজীবীদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা, ভালোবাসা এবং সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
সিনিয়রদের সম্মান দিয়ে, তরুণদের পাশে নিয়ে এবং সমসাময়িকদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি আইনজীবীদের একটি অভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বলয়ে নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। এ কারণেই আইনজীবী সমাজের একটি বড় অংশের কাছে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন; তিনি আইনজীবীদের ঐক্যের প্রতীকও বটে।
কেন তাঁর নেতৃত্ব আলাদা?
সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনের একটি প্রচলিত বাস্তবতা হলো, এখানে প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং নিজস্ব চিন্তা ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে অত্যন্ত দৃঢ়। অনেক বিজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সিনিয়র আইনজীবী রয়েছেন, যাঁদের নিজস্ব পরিকল্পনা, রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক চিন্তাভাবনা রয়েছে। তাঁদের সবাইকে একই সিদ্ধান্তে নিয়ে আসা, একই লক্ষ্যে কাজ করানো কিংবা একটি অভিন্ন নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। অনেকের কাছে এটি প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সেই কঠিন কাজটি করতে পেরেছেন। তিনি বুঝেছিলেন, আইনজীবীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে কাউকে ছোট করে নয়, বরং সবাইকে সম্মান দিয়ে সামনে এগোতে হয়। নেতৃত্ব মানে শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়; নেতৃত্ব মানে মানুষের আস্থা অর্জন করা, তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের ঐক্য ও সাংগঠনিক সাফল্য বারবার দৃশ্যমান হয়েছে। আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।
আজকের বাস্তবতা: আইন অঙ্গনে নেতৃত্বের সংকট ও বিভক্তির রাজনীতি—
আজ বাংলাদেশ এক কঠিন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে বিভ্রান্তি, অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা লক্ষ্য করছি, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ঘিরে নতুন করে নানা ধরনের বিভক্তি ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার নামে নগ্ন ষড়যন্ত্র সামনে আসছে।
আমার পর্যবেক্ষণে, যারা একসময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করার পেছনে ভূমিকা রেখেছে, দায়িত্ব এড়িয়েছেন এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সরকার পতনের ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাদের কেউ কেউ এখন আইন অঙ্গনে আওয়ামী লীগের রক্ষক কিংবা অভিভাবক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় কমিটি গঠনের নামে বিভক্তির রাজনীতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একমাত্র পেশাজীবি গঠনতান্ত্রিক বৈধ সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ কে চ্যালেঞ্জ জানানো সহ সাংগঠনিক শক্তিকে আরও দুর্বল করে তুলছে।
আইন অঙ্গনকে ঘিরেও নানা ধরনের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ ও ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা সবাই জানি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে দীর্ঘ সময় ধরে নানা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা চলেছে। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে আইন অঙ্গনের ভূমিকা, আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব নিয়ে অনেক প্রশ্ন সামনে আসে।
আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আইন অঙ্গনে আমাদের সাংগঠনিক প্রস্তুতি কোথায় ছিল? যারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন? আমাদের নিজেদের মধ্যকার বিভক্তি ও সমন্বয়হীনতা কি সেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল?
আজ অনেকেই ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের অনুপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তাঁর নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার অপচেষ্টা করেন। আমার বিবেচনায়, এটি সঠিক মূল্যায়ন নয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পর স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি মৌলবাদীদের অন্যতম টার্গেট ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নুর তাপস। তারা সুযোগ পেলেই যেকোনো সময় তাঁর জীবন নাশ ঘটাতে পারে যেভাবে ৭৫ সালে তাঁর পিতা শহীদ শেখ ফজলুল হক মনি ও তাঁর মাতা শেখ আরজু মনি কে বঙ্গবন্ধুর সাথে সপরিবারে পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যন্ত নৃশংস ভাবে হত্যা করেছিল। ইতিপূর্বে তাঁর উপর বোমা হামলাও করেছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শত্রুরা। তিনি যখন যে দায়িত্ব পেয়েছেন, তা অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। তাঁর সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার আগে তাঁর অতীতের কাজ ও অর্জনগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২০২৩ সালের ২১ অক্টোবর মহাসমাবেশের কথা স্মরণ করুন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানাতে সমগ্র বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক আইনজীবীকে নিয়ে যে বিশাল আইনজীবী মহাসমাবেশ আয়োজন করা হয়েছিল, সেখানে প্রায় ৩০ হাজার আইনজীবীর অংশগ্রহণ ছিল বলে আমার স্মরণে আছে। এত বিপুলসংখ্যক আইনজীবীকে এক জায়গায় সংগঠিত করা, তাঁদের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা এবং একটি সুশৃঙ্খল আয়োজন উপহার দেওয়া নিঃসন্দেহে বড় সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয়। যেটা অত্যন্ত দক্ষতা ও সফলতার সাথে আয়োজন সুসম্পন্নন করেছিলেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।
তাঁর রাজনৈতিক ও পেশাগত জীবনের দায়িত্বগুলোও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ধানমন্ডি সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী ঢাকা- ১০ আসনের বারবার নির্বাচিত সফল সংসদ সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশের মানুষের প্রয়োজনে, ঢাকাবাসীর প্রয়োজনে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে মনোনয়ন দেন। তিনি নির্বাচিত হয়ে ঢাকাবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, নগর ব্যবস্থাপনা ও একটি বাসযোগ্য শহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পক্ষে আগের মতো নিয়মিত আদালতকেন্দ্রিক পেশাগত কর্মকাণ্ডে সময় দেওয়া ও সাংগঠনিক গতিবিধি, আদালত ঘিরে সকল ষড়যন্ত্রের উপর সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁর এই রাষ্ট্রীয় ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক দায়িত্ব পালনের সময় আইন অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তাঁকে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না? যাঁরা তখন আইন অঙ্গনের সাংগঠনিক দায়িত্বে, বার কেন্দ্রিক দায়িত্বে ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কি তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছিলেন? যদি দায়িত্বশীলদের কেউ কেউ সাংগঠনিক ব্যর্থতা কিংবা ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে থাকেন—তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ কোথায়?
আমার কাছে এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
আজকের আইন অঙ্গনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতিসহ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ জেলা আইনজীবী সমিতি গুলো জবর দখল করে নিয়েছে বাংলাদেশ বিরোধী অপশক্তিরা এসব পরিস্থিতিতে আমাদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিরোধ কোথায়? আমাদের কার্যকর কর্মসূচি কোথায়?
আইনজীবীদের অধিকার, পেশাগত স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আমাদের সম্মিলিত অবস্থান কোথায়?
যাঁরা আজ বিভিন্ন কমিটি গঠন করে নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন, তাঁদের কাছে আমার কয়েকটি প্রশ্ন রয়েছে।
আইন অঙ্গনের এই কঠিন পরিস্থিতিতে তাঁরা কী কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সহ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দদের মিথ্যা, ভিত্তিহীন অবৈধ বেআইনি মামলায় অবৈধ ট্রাইবুনাল কতৃক অবৈধ বেআইনি ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত তৈরিতে, উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ সহ কোন রাজনৈতিক কর্মসুচির পদক্ষেপ নেওয়ার সাহসীকতা ও দৃশ্যমান কোন সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখাতে পেরেছে কি-না?
ভোট বিহীন এডহক কমিটির নামে বার কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ ও কার্যক্রম নিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে তাঁরা কী ধরনের সাংগঠনিক প্রতিবাদ গড়ে তুলেছেন? কোন আইনগত প্রতিকারের তাগিদে পদক্ষেপ নিয়েছে কি-না?
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি কিংবা ঢাকা আইনজীবী সমিতির বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁদের ভূমিকা কী?
চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য আইনজীবী সমিতিতে আইনজীবীদের অধিকার ও পেশাগত স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁরা কী কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছেন?
রাজনৈতিক মামলায় আটক নেতাকর্মীদের ন্যায়বিচার ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে তাঁদের দৃশ্যমান ভূমিকা কী?
যদি কোনো বিচারপ্রক্রিয়া বা ট্রাইব্যুনালের বৈধতা নিয়ে গুরুতর সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন থাকে, তাহলে সেই প্রশ্নগুলো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় তুলে ধরার জন্য তাঁরা কী উদ্যোগ নিয়েছেন?
আমরা কি কখনো তাঁদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট, সাহসী ও কার্যকর নেতৃত্ব দেখতে পেয়েছি?
নাকি বিভিন্ন ফটোসেশন, আনুষ্ঠানিক বৈঠক ও বৈকালিক আড্ডার মধ্যেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ থাকছে?
আমি কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করতে চাই না। কিন্তু নেতৃত্বের দাবি করলে নেতৃত্বের যোগ্যতারও প্রমাণ দিতে হয়। শুধু একটি কমিটিতে পদ-পদবি থাকলেই নেতা হওয়া যায় না। নেতা হতে হলে আস্থা অর্জন করতে হয়, সংকটে সামনে দাঁড়াতে হয় এবং কঠিন সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়।
আজ আমাদের প্রয়োজন এমন আইনজীবী নেতৃত্ব, যাঁর কথা আইনজীবীরা শুনবেন, যাঁর আহ্বানে আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হবেন এবং যাঁর পরিকল্পনায় একটি কার্যকর সাংগঠনিক শক্তি গড়ে উঠবে। এই জায়গায় ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের কোনো বিকল্প আমি দেখছি না।
কেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসই সবসময় আইনজীবীদের একমাত্র উপযুক্ত নেতৃত্ব?
আমি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আইন অঙ্গনের রাজনীতি, সাংগঠনিক বাস্তবতা, নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা এবং আইনজীবীদের মনস্তত্ত্ব খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, বাংলাদেশের আইন অঙ্গনে আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করার মতো নেতৃত্বের যে গুণাবলি প্রয়োজন, তার সমন্বয় ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের মধ্যে রয়েছে।
তিনি মেধাবী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী এবং সাংগঠনিকভাবে দক্ষ। তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি বিভিন্ন বয়স, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের আইনজীবীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে জানেন।
আমার বিশ্বাস, অতীতে তিনি যেভাবে আইনজীবীদের বিভক্তি কাটিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, বর্তমানের আরও কঠিন বাস্তবতাতেও সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারবেন। আমরা যদি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনা করি, তাহলে আইনজীবীদের ঐক্যবদ্ধ করার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দেশে আসন্ন ডিসেম্বরে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা প্রত্যাশা ও আলোচনা রয়েছে। তিনি দেশে ফিরলে তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী, নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সামনে আইনি ও সাংগঠনিকভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ আসবে। বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, আইনি জটিলতা এবং আদালতকেন্দ্রিক নানা পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সুসংগঠিত আইনজীবী শক্তির প্রয়োজন হবে।
বর্তমান বাংলাদেশে প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার আইনজীবীকে স্বাধীনতার পক্ষের রাজনৈতিক আদর্শের সমর্থক হিসেবে বিবেচনা করলেও, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি কার্যকর ও সুসংগঠিত আইনজীবী শক্তিতে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়।
আমি মনে করি, অন্তত ২০ হাজার আইনজীবীকে একটি কার্যকর সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার সক্ষমতা ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের রয়েছে। অন্য কারও সেই সক্ষমতা আছে কি না, তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
এটি কোনো আবেগনির্ভর অনুমান নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং আইন অঙ্গনের বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করেই আমি এই মূল্যায়নে পৌঁছেছি।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে আইন অঙ্গনের গুরুত্ব—
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে যদি আবার জনগণের আস্থা অর্জন করে রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তাহলে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা কমিটি গঠন যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন হবে আত্মসমালোচনা, সাংগঠনিক পুনর্গঠন, যোগ্য নেতৃত্বের মূল্যায়ন এবং পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে কার্যকর করে তোলা।
বিশেষ করে আইন অঙ্গনের গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ, একটি রাজনৈতিক দলের অধিকার, সাংবিধানিক অবস্থান, নেতাকর্মীদের আইনি সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আইনজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনজীবীরা শুধু একটি পেশাজীবী গোষ্ঠী নন; তাঁরা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।সুতরাং আইন অঙ্গনে একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।
আমার কাছে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সেই নেতৃত্বের অন্যতম উপযুক্ত প্রতিনিধি। তিনি একই সঙ্গে একজন আইনজীবী, একজন রাজনীতিবিদ এবং একজন সাংগঠনিক নেতৃত্বের অধিকারী। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, পেশাগত পরিচিতি ও আইনজীবীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে কাজে লাগানো গেলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের মধ্যে নতুন করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
আরও একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। বর্তমান বাংলাদেশে তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আমি মনে করি, অভিজ্ঞতার সঙ্গে তারুণ্যের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একটি রাজনৈতিক সংগঠন নতুন শক্তি অর্জন করতে পারে। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস সেই সমন্বয়ের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। তাঁর মধ্যে অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করার সক্ষমতা রয়েছে। বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণের কাছে তিনি অনুপ্রেরণার একটি নাম।
পরিশেষে—
আমি আবারও বলছি, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বের প্রশ্নটি আমার কাছে কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়। এটি আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আইন অঙ্গনের বাস্তবতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার মূল্যায়ন। বিশেষ করে যাঁরা কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, যাঁরা বিভক্তিকে ঐক্যে রূপ দিয়েছেন এবং যাঁরা নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো উচিত।
আজ আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিভক্তি নয়, ঐক্য; ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থ নয়, সাংগঠনিক দায়িত্ববোধ; পদ-পদবির প্রতিযোগিতা নয়, যোগ্য নেতৃত্বের প্রতিষ্ঠা।
আমি প্রত্যাশা করি, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের নেতৃত্বে বাংলাদেশের আইনজীবী সমাজ আবারও ঐক্যবদ্ধ হবে, দেশের প্রতিটি প্রান্তের স্বাধীনতার পক্ষের আইনজীবীরা একটি অভিন্ন সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত হবেন।
আইন অঙ্গনে পেশাগত স্বাধীনতা, সাংবিধানিক অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আমরা একটি শক্তিশালী, দায়িত্বশীল ও কার্যকর অবস্থান গড়ে তুলতে পারব।
আমার বিশ্বাস, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের মতো মেধাবী, বিচক্ষণ ও আন্তর্জাতিক মানের আইনজীবী ও রাজনৈতিক তথাপি পেশাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতৃত্ব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য সম্পদ।
এই নেতৃত্বের কোনো বিকল্প আমি অন্তত আইন অঙ্গনে দেখছি না। ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বিভক্তির রাজনীতি পরিহার করে বারবার ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের অপরিহার্য ও অনিবার্য নেতৃত্বে বাংলাদেশের আইনজীবী সমাজ এবং ঢাকা শহরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে নবজাগরণের গণবিপ্লব সংগঠিত হোক —এটাই আমার প্রত্যাশা।
লেখক— এস. আর. সিদ্দিকী সাইফ
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট,
সাবেক সহকারী এটর্নি জেনারেল, বাংলাদেশ।