মুখপত্র
প্রিন্ট এর তারিখঃ ০২ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:০১ পিএম  ||  প্রকাশের তারিখঃ ২৪ জুন, ২০২৫, ০৭:৫৩ পিএম

খুলতে পারে সম্ভাবনার দ্বার: বাংলাদেশে যেভাবে কাজ করবে ‘গুগল পে’

জাতীয়
Sub Editor
দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রা শুরু করেছে গুগল পে। সিটি ব্যাংক, গুগল, মাস্টারকার্ড ও ভিসা যৌথভাবে বাংলাদেশে এ সেবা চালু করলো। প্রাথমিকভাবে কেবলমাত্র সিটি ব্যাংকের গ্রাহকরা গুগল পে পেমেন্ট ব্যবহার করার জন্য গুগল ওয়ালেটে তাদের মাস্টারকার্ড বা ভিসা কার্ড যুক্ত করে কেনাকাটা করতে পারবেন। প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, গুগল পে ফ্রিলান্সিংসহ আউট সোর্সিংয়ে উপার্জিত আয় দেশে আনার মতো সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। মঙ্গলবার ( ২৪ জুন) রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর গুগল পে’র উদ্বোধন করেন। গুগল পে ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে ট্যাপ করেই দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন করা যাবে। এজন্য লাগবে কেবল একটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন, গুগল পে অ্যাপ এবং বর্তমানে কেবল সিটি ব্যাংক কার্ড। এর ফলে এখন থেকে সিটি ব্যাংকের গ্রাহককে আর ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড পকেটে বহন করতে হবে না। স্মার্ট মোবাইলফোনেই এ সেবা মিলবে। ক্রয় সম্পর্কিত সব লেনদেন এই স্মার্ট মোবাইলফোনেই করা যাবে। আর্থিকখাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক ও দেশে প্রথম গুগল পে সেবা নিয়ে আসা সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আপাতত একটি ব্যাংকের গ্রাহকরা এ সেবা পেলেও পরবর্তীতে অন্যান্য ব্যাংকের কার্ডওধারীরা এ সেবা পাবেন। আর এই লেনদেনের জন্য ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে গুগল কোনো চার্জ নেবে না। দেশের ফ্রিলান্সিং পেশায় নিয়োজিত তরুণদের রেমিট্যান্স দেশের আনার ক্ষেত্রে পেপ্যালের মতো প্রতিষ্ঠান দেশে আসতে বাধা তৈরি হয়েছে। দেশে গুগল পে সেবা চালুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সেই প্রতিবন্ধকতা দূর হতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বলেন, আপাতত বাণিজ্যিক ব্যাংকটি লেনদেনে ব্যবহারের জন্য অনুমতি নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেটা চাচ্ছে বাংলাদেশে পেমেন্টে ইকো সিস্টেমটা গড়ে উঠুক। এজন্য আমরা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য এ রকম অনেকই কিছুই করছি। তিনি বলেন, গুগল দেশে এলো, খুব বেনিফিট নিয়ে এলো- তা বলবো না, গুগল পে আমাদের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং সৃষ্টি করল। গুগল পে এখন বাংলাদেশে! এখন পেপল বলবে আমরা কেন না! অন্যদের আসার পথ সুগম করার জন্য আমরা এ রকম বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেট্রোনাইজ করছি। দেশে ফ্রিলান্সিং করে প্রায় ১০ লাখ তরুণ। এসব তরুণ ফ্রিলান্সি প্রায় বার হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খুব সামান্যই ব্যাংকিং চ্যানেল দেশে আসে। বাকি টাকা অন্য কোনোভাবে দেশে আনে বা বিদেশে থেকে যায়। ফ্রিলান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্জিত এই অর্থ দেশে আনতে জন্য পেপলের মতো গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু নানা কারণে দেশে এমন গেটওয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে দেশে আনা সম্ভব হয়নি। গুগল পে বাংলাদেশে কাজ শুরু করলে পেপলের দেশে আসার পথ উন্মুক্ত হতে পারে। পেপ্যালের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দেশে আসার ক্ষেত্রে অতীতে টাকা পাচার প্রসঙ্গ আলোচনায় এসেছে। পেপ্যাল এলে দেশে রেমিট্যান্স আসার পাশাপাশি টাকার পাচার হওয়ার মতো ঘটনা বেড়ে যেতে পারে বলা হয়েছে। কিন্তু একটি সুশৃঙ্খল আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলে গেটওয়ের মাধ্যমে পাচার নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব বলে মনে করছেন আর্থিকখাত সংশ্লিষ্টরা। দেশে গুগল পে’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকর গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশে গুগল পে-কে স্বাগত জানাই। আমার বিশ্বাস, গুগল পে বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হবে। তিনি বলেন, এটা একটা ভুল ধারণা যে এটা ব্যবহার করে বিদেশিরা কেবল দেশ থেকে অর্থ নিয়ে যাবে। আমি এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত না। যারা বিনিয়োগ করে টাকা নিয়ে যাবে, আবার টেকনোলজিও দিয়ে যাবে। আমরা সেই পথ থেকে এগাচ্ছি। বাংলাদেশে যেভাবে ব্যবহার হবে গুগল পে গুগল পে নামে পরিচিত গুগল ওয়ালেট কন্টাক্টলেস লেনদেনে সহায়ক। প্ল্যাটফর্মটিতে 'ট্যাপ টু পে' ফাংশন রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকরা সরাসরি কার্ড ব্যবহার না করেই লেনদেন করতে পারে, যা পেমেন্টকে আরও সহজ করে। যা লাগবে গুগল ওয়ালেটের 'ট্যাপ টু পে' ফিচারটি ব্যবহার করতে মোবাইলে 'নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন বা এনএফসি' থাকতে হবে। সাধারণত Settings > Connected devices > Connection preferences অপশন থেকে এনএফসি পাওয়া যাবে। পেমেন্ট এমন দেশ থেকে ইস্যু করতে হবে যেখানে গুগল ওয়ালেট সমর্থন করে। কন্টাক্টলেস লেনদেনের জন্য এটি ব্যবহার করতে গুগল ওয়ালেটকে ডিভাইসে ডিফল্ট পেমেন্ট অ্যাপ হিসেবে সেট করতে হবে। গুগল ওয়ালেটে 'ট্যাপ টু পে' সেটআপ গুগল ওয়ালেট খুলুন: আপনার ফোনে গুগল ওয়ালেট অ্যাপ চালু করুন। পেমেন্ট সেটআপ অ্যাক্সেস করুন: উপরের ডানদিকের কোণায় আপনার প্রোফাইল ছবি বা অ্যাকাউন্ট আইকনে ট্যাপ করুন। তারপর পেমেন্ট সেটআপ নির্বাচন করুন। এনএফসি চালু করুন: পূর্ববর্তী নির্দেশাবলী অনুসরণ করে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে মোবাইলে এনএফসি চালু আছে। গুগল ওয়ালেটকে ডিফল্ট পেমেন্ট অ্যাপ করুন: মোবাইলের ফোন সেটিংসে কন্টাক্টলেস পেমেন্টের জন্য গুগল ওয়ালেটকে ডিফল্ট পেমেন্ট অ্যাপ হিসেবে সেট করতে হবে। কন্টাক্টলেস পেমেন্ট পদ্ধতি যোগ করুন: একটি ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড যোগ করতে হবে। গুগল ওয়ালেটে কার্ডের ব্যাল্যান্স দেখা: গুগল ওয়ালেট অ্যাপে যুক্ত করা কার্ডের উপরে যদি কোনো ম্যাসেজ না থাকে তাহলে সেটি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। যদি কোনো ম্যাসেজ থাকে তাহলে সেখানে যা করতে বলা হচ্ছে, সেগুলো পূরণ করতে হবে। সেখানে ম্যাসেজ থাকতে পারে যে, কার্ড সেটআপ হয়নি বা এনএফসি চালু করুন। যদি কার্ড সাসপেন্ড করা হয়, সেক্ষেত্রে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। স্ক্রিনলক সেটআপ: মোবাইলের স্ক্রিনলক (যেমন: পিন, প্যাটার্ন, ফিঙ্গারপ্রিন্ট) নিশ্চিত করতে হবে। পেমেন্ট নিরাপদ করতে এটা খুবই জরুরি। গুগল ওয়ালেট দিয়ে লেনদেন মোবাইল আনলক: প্রথমেই পিন, প্যাটার্ন বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে মোবাইল ফোনটি আনলক করে নিতে হবে। অবশ্য, গুগলের নির্দেশনা অনুযায়ী, গুগল ওয়ালেট অ্যাপ খোলার বা পেমেন্ট রিডারের সামনে মোবাইল ধরার আগে ফোন আনলক করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে লেনদেনটি যাচাই করে দিতে হবে। ফোল্ডেবল মোবাইলে ট্যাপ টু পে ব্যবহার করার জন্য সেটি খুলতে হবে। পেমেন্ট রিডার: কন্ট্যাক্টলেস পেমেন্ট রিডারের কাছে মোবাইলফোনের পেছনের অংশটি ধরলে লেনদেনটি যাচাই করতে বলবে। পেমেন্ট: যাচাই করে দেওয়ার পর লেনদেন সফল হলে মোবাইলের স্ক্রিনে নীল চেক চিহ্ন দেখা যাবে।  

ইতিবাচক দিক:

  1. সুবিধাজনক ও নিরাপদ লেনদেন: গুগল পে-এর মাধ্যমে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা কন্টাক্টলেস পেমেন্ট (Tap to Pay) করতে পারবেন, যা লেনদেনকে দ্রুত ও নিরাপদ করবে। এতে কার্ড বহনের প্রয়োজনীয়তা কমবে।

  2. ফ্রিল্যান্সিং সেক্টরে গতি: বাংলাদেশের প্রায় ১০ লাখ ফ্রিল্যান্সারের জন্য গুগল পে একটি বিশ্বস্ত পেমেন্ট গেটওয়ে হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি পেপ্যালের বিকল্প হিসেবে রেমিট্যান্স আনতে সহায়তা করবে, যা বর্তমানে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত হয়।

  3. অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব: বৈদেশিক মুদ্রা আনার ক্ষেত্রে গুগল পে একটি নিয়মিত চ্যানেল তৈরি করতে পারে, যা রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও ডলারের চাপ কমাতে সাহায্য করবে।

  4. অন্যান্য আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবার আগমন: গুগল পে-এর সফলতা পেপ্যাল বা অন্যান্য গ্লোবাল পেমেন্ট সিস্টেমকে বাংলাদেশে আসতে উৎসাহিত করতে পারে।

  5. কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং: গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে উপস্থাপন করবে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে।

চ্যালেঞ্জ ও বিবেচ্য বিষয়:

  1. সীমিত ব্যাংক অংশগ্রহণ: প্রাথমিকভাবে শুধুমাত্র সিটি ব্যাংকের গ্রাহকরা গুগল পে ব্যবহার করতে পারবেন। অন্যান্য ব্যাংক যুক্ত না হলে এর সুবিধা সীমিত থাকবে।

  2. এনএফসি-সক্ষম ডিভাইসের প্রাপ্যতা: "Tap to Pay" ফিচার ব্যবহারের জন্য এনএফসি (NFC) সমর্থিত স্মার্টফোন প্রয়োজন, যা বাংলাদেশের অনেক ব্যবহারকারীর নেই।

  3. টাকা পাচারের ঝুঁকি: বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে পেপ্যালের মতো প্ল্যাটফর্মকে টাকা পাচারের উদ্বেগের কথা বলেছে। গুগল পে-এর ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিং প্রয়োজন।

  4. প্রতিযোগিতা ও স্থানীয় সমাধান: বিকাশ, নগদ, রকেটের মতো স্থানীয় মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিসের সঙ্গে গুগল পে-এর প্রতিযোগিতা হতে পারে। তবে গুগল পে-এর বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা এটিকে আলাদা করবে।

  5. চার্জিং স্ট্রাকচার: বর্তমানে গুগল পে ব্যবহারকারীদের কোনো চার্জ না নিলেও ভবিষ্যতে ফি কাঠামো পরিবর্তন হতে পারে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা:

  • গুগল পে ধীরে ধীরে ফান্ড ট্রান্সফার, বিল পেমেন্ট, মোবাইল রিচার্জ এবং ইন্টারন্যাশনাল পেমেন্ট-এর মতো সেবা চালু করতে পারে।

  • ফ্রিল্যান্সারদের জন্য সরাসরি ইনভয়েস পেমেন্টের সুবিধা চালু হলে রেমিট্যান্স প্রক্রিয়া সহজ হবে।

  • বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা সহায়ক হলে পেপ্যাল বা অন্যান্য গ্লোবাল পেমেন্ট সিস্টেম আসতে পারে।

সম্পাদক ও প্রকাশক | উইনিং গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান।

© 2026 মুখপত্র। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।