চার দশকেরও বেশি সময় পর নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন এলো বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপিতে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে তারেক রহমান দলের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর দুই সপ্তাহের মাথায় এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
শুক্রবার রাতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তারেক রহমানকে দলের চেয়ারম্যান ঘোষণা করা হয়। রাত ৯টায় তার সভাপতিত্বে শুরু হওয়া বৈঠক শেষে রাত ১০টা ৪০ মিনিটে বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, “জাতীয় স্থায়ী কমিটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং তিনি যেন দল পরিচালনায় সফল হন, সে জন্য দোয়া করেছে
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “চেয়ারম্যান হলে আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকে না।”
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান ও হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
বিএনপির ইতিহাসে তারেক রহমান চতুর্থ চেয়ারম্যান। বিচারপতি আব্দুস সাত্তার স্বল্প সময় দল পরিচালনা করলেও মূলত জিয়া পরিবারই দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিয়ে আসছে।
খালেদা জিয়া ২০১৮ সালে কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দল পরিচালনা করছিলেন। প্রায় সাত বছর তিনি লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দেন। মায়ের মৃত্যুর পর জাতীয় স্থায়ী কমিটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের মধ্য দিয়ে তার চেয়ারম্যান পদ চূড়ান্ত হলো।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা খালেদা জিয়া ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩০ ডিসেম্বর ভোরে মারা যান। পরদিন জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে জানাজা শেষে জিয়া উদ্যানে তার স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়। বিএনপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে তিনি বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে তিনি মায়ের সঙ্গে দেশব্যাপী প্রচারে অংশ নেন।
২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি স্থানীয় সরকার, সুশাসন ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি অফিস স্থাপন করেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এলেও তিনি তখন কোনো সরকারি পদ গ্রহণ করেননি।
২০০২ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটি তাকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক পদে মনোনীত করে। তবে ২০০৭ সালের জরুরি অবস্থায় ৭ মার্চ ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে যৌথ বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে তখন ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর যৌথ বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রায় ১৮ মাস কারাবাসের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের জামিনে মুক্তি পান তিনি। মুক্তির রাতেই স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। শুরু হয় দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই বিএনপির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।
২০১০ সালে খালেদা জিয়া শহীদ মইনুল সড়কের বাসা থেকে উচ্ছেদ হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি সংসদের বাইরে চলে যায় এবং রাজপথকেন্দ্রিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
২০১৫ সালে তারেক রহমানের ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু পরিবার ও দলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। সেই সময়েও তিনি দেশে ফিরতে পারেননি। তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় নবায়ন করা হয়নি। বহু মামলার কারণে আদালতের চোখে তিনি ছিলেন পলাতক। একপর্যায়ে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আরও ৭২টি মামলা হয়। মোট পাঁচটি মামলায় তার সাজা হয়, যার মধ্যে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হাইকোর্ট তার বক্তব্য ও বিবৃতি প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে সেদিনই বিএনপির স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়।
২০২০ সালে নির্বাহী আদেশে খালেদা জিয়াকে সাময়িক মুক্তি দেওয়া হলেও শর্তের কারণে তিনি বাসা ও হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আর সক্রিয় ছিলেন না।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি তার সাজা মওকুফ করেন। পরে উচ্চ আদালত দুর্নীতির মামলায় তাকে খালাস দেয়। একই সময়ে তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও দেওয়া বিভিন্ন সাজা বাতিল হয়, যা তার দেশে ফেরার পথ তৈরি করে।
ফেব্রুয়ারিতে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গেলে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক হয়। ওই বৈঠকেই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে তারা একমত হন বলে জানা যায়।
৩ নভেম্বর বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য আংশিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে বগুড়া-৬ আসন থেকে প্রথমবারের মতো প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন তারেক রহমান।
১২ ডিসেম্বর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফিরবেন। অবশেষে ওই দিন কয়েক লাখ নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে তিনি দেশে ফেরেন এবং সংবর্ধনা সভায় বলেন, “আই হ্যাভ আ প্ল্যান।”
এখন দলটির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের সামনে বড় দায়িত্ব—দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা, নির্বাচনমুখী কৌশল নির্ধারণ এবং দীর্ঘ আন্দোলনের পর বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরানোর প্রস্তুতি নেওয়া।