বাংলাদেশে নতুন নেতৃত্ব? তারেক রহমানকে এগিয়ে দেখছে দ্য ইকোনমিস্ট
নিউজ ডেস্ক
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাপ্তাহিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শীর্ষ দাবিদার হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সর্বশেষ সংখ্যার এক বিশ্লেষণে সাময়িকীটি জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সরকার গঠনের দৌড়ে তিনি এগিয়ে আছেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়, প্রায় দেড় বছর আগে সংঘটিত এক ‘বিপ্লব’-এর পর এটি দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ওই আন্দোলনে ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটে বলে মন্তব্য করেছে সাময়িকীটি। তাদের মতে, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে সহায়ক হবে।
তারেক রহমানকে নিয়ে এই পূর্বাভাস টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়।
২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার দৃশ্য বর্ণনা করে দ্য ইকোনমিস্ট জানায়, বুলেটপ্রুফ বাসে তার যাত্রাকালে উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা রাস্তায় ভিড় করেন, ফলে কয়েক মাইল পথ বাসটি ধীরগতিতে এগোয়—যেন অপেক্ষমাণ মানুষ তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন।
সাময়িকীটির দাবি, ২০০৮ সালের পর দেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন হয়নি এবং প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। নিরাপত্তা বিষয়ক থিঙ্কট্যাংক বিআইপিএসএস-এর শাফকাত মুনিরের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দশক ধরে তার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না; তবে বর্তমানে রাজধানীর রাস্তায় নির্বাচনী ব্যানারে ভরপুর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ বড় দায়িত্ব হবে এই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করা। অধিকাংশ মানুষের মতে, সরকারটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে নতুন স্বৈরতন্ত্র ঠেকাতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে—যার মধ্যে নতুন উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার কথা রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে বিশ্লেষণে বলা হয়, দলটি সংযত শাসনের আশ্বাস দিলেও শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যে তাদের অগ্রগতি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দলটি কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি এবং অতীতে সংসদে তাদের আসনসংখ্যা কখনো ১৮ ছাড়ায়নি—এ কারণে দেশ পরিচালনায় অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটেই, দ্য ইকোনমিস্ট মনে করে, তারেক রহমানের জন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। জনমত জরিপে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। দলটির নেতৃত্বের ইতিহাস তুলে ধরে সাময়িকীটি স্মরণ করায়, প্রয়াত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি তিনবার ক্ষমতায় ছিল এবং তার আগে দলটি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় ছিলেন তারেক রহমানের বাবা, যিনি পরে রাষ্ট্রপতি হন ও ১৯৮১ সালে নিহত হন।
নীতিগত অঙ্গীকার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান নির্বাচিত হলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির সুযোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথাও তিনি বলেছেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের অঙ্গীকারের কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়। ২০২৪ সালের বিক্ষোভে নিহতদের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের কথা বললেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
দ্য ইকোনমিস্ট উল্লেখ করে, দেশে ফেরার পর থেকে তারেক রহমান জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে বক্তব্য দিলেও, অনেকেই এখনো ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন—নির্বাচনী অনিশ্চয়তার কারণে। পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডনফেরত এই রাজনীতিককে আগের তুলনায় বদলে যাওয়া এক নেতা হিসেবেই দেখা যাচ্ছে।