ডিবি হারুনের ক্যাশিয়ার ’ডিবি মাতা’ আসমার খুঁটির জোর কোথায়?
অনলাইন ডেস্ক
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জটিল-চাঞ্চল্যকর অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য দেশের অন্যতম বিশ্বস্ত বিশেষায়িত সংস্থা 'পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন' (পিবিআই)। কিন্তু এই সংস্থাকেই ব্যক্তিগত আখের গোছানো এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের আখড়ায় পরিণত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে পিবিআই মুন্সিগঞ্জ কার্যালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এডিশনাল এসপি) আসমা আরা জাহানের বিরুদ্ধে। তদন্তাধীন হত্যা মামলার প্রধান আসামিকে গোপন সমঝোতায় ছেড়ে দেওয়া, অফিস ফাঁকি দিয়ে জিমনেসিয়ামে সময় কাটানো, সরকারি গাড়ির যথেচ্ছ অপব্যবহার এবং সাবেক ডিবিপ্রধান হারুনের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অন্ধকার অধ্যায় বেরিয়ে এসেছে অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জের একটি অতি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার এজাহারনামীয় প্রধান অভিযুক্তদের আইনগত প্রক্রিয়া এড়িয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পিবিআই মুন্সিগঞ্জ কার্যালয়ের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) হায়দার উক্ত মামলার তদন্তভার পাওয়ার পর সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেছিলেন।
কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, এডিশনাল এসপি আসমা আরা জাহানের সরাসরি নির্দেশ, প্রত্যক্ষ মধ্যস্থতা এবং মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে পর্দার আড়ালে এই 'আসামি মুক্তি বাণিজ্য' সম্পন্ন হয়। গ্রেপ্তারের পর আসামিদের আদালতে না পাঠিয়ে রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। নিহতের স্বজনদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—আইন যেখানে রক্ষক, সেখানে পিবিআই-এর হাত ধরেই কি পার পেয়ে যাবে খুনির দল?
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সকাল ৯টার মধ্যে দপ্তরে উপস্থিত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, এডিশনাল এসপি আসমা আরা জাহানের কাছে তা কেবলই কাগজের নিয়ম। তিনি সম্পূর্ণ নিজের খেয়ালখুশিমতো এবং ইচ্ছামাফিক বিলম্বে কার্যালয়ে আসেন।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যখন সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনা এবং তদন্ত তদারকিতে ব্যস্ত থাকার কথা, ঠিক সেই 'অফিস চলাকালীন সময়েই' তিনি নিয়মিত স্থানীয় একটি জিমনেসিয়ামে (জিমে) যান এবং দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন। একজন প্রথম শ্রেণীর দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার এমন অপেশাদার ও বিধি-বহির্ভূত আচরণে অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে, যার ফলে ভেঙে পড়েছে পিবিআই মুন্সিগঞ্জের অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড।
রাষ্ট্রীয় এবং দাপ্তরিক কাজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি গাড়ি ও জ্বালানির চরম অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে এই নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। গত ঈদের সরকারি ছুটির দিনগুলোতে, যখন জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ সতর্কতার প্রয়োজন ছিল, তখন তিনি দাপ্তরিক প্রটোকল সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করেন। পিবিআই-এর সরকারি গাড়ি নিয়ে ব্যক্তিগত সফরে নিজের শ্বশুরবাড়িতে যান এবং দীর্ঘ ছুটি কাটান। সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে রাষ্ট্রীয় খরচে এই পারিবারিক বিনোদন ও ব্যক্তিগত সফর পরিচালনার ঘটনাটি স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আসমা আরা জাহানের স্বামী তুষার বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক (Assistant Director) হিসেবে কর্মরত। স্বামীর এই পরিচয়কে ঢাল ও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন আসমা। কার্যালয়ের কোনো সহকর্মী বা ভুক্তভোগী উনার কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে বা মুখ খুললে তাকে 'দুদকের মামলা' বা প্রশাসনিক হয়রানির ভয় দেখানো হয়। এই কারণে পিবিআই মুন্সিগঞ্জ কার্যালয়ে এক ধরণের একচ্ছত্র আধিপত্য ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে রাখা হয়েছে।
আসমা আরা জাহানের এই বেপরোয়া আচরণের মূল উৎস লুকিয়ে আছে তার অতীত কর্মস্থলে। ৩০তম বিসিএস ব্যাচের এই কর্মকর্তার বাড়ি বিতর্কিত সাবেক ডিবিপ্রধান হারুন-অর-রশিদের এলাকায়। হারুন সিন্ডিকেটের অন্যতম এই সদস্য এক সময় ডিবিতে 'ডিবি-মাতা' হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন ৩১ ব্যাচের কর্মকর্তা বদরুজ্জামান জিল্লু, যার সঙ্গে কিশোরগঞ্জ সার্কেলে এএসপি হিসেবে কর্মরত থাকার সময় থেকেই আসমার সখ্যতা গড়ে ওঠে।
ডিবিতে থাকাকালীন আসমা আরা জাহানের অর্থলিপ্সা চরমে পৌঁছায়। সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রায় দেড় বছর আগে আওয়ামী লীগ নেতা শাহজাদা মহিউদ্দিনের কাছ থেকে জোরপূর্বক হাতিয়ে নেওয়া ৩৪ কোটি টাকার ভাগাভাগি নিয়ে স্বয়ং ডিবিপ্রধান হারুনের সাথেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন আসমা। বিষয়টি পুলিশের উচ্চপর্যায়ে জানাজানি হলে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে আসমাকে ডিএমপি সদর দপ্তরের প্রটেকশন বিভাগে বদলি করেছিল। তবে পতিত হাসিনা সরকারের শেষ দিকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি আবারও পুনর্বাসিত হন। এছাড়া, ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী 'জুলাই আন্দোলনে' দমনপীড়নের পেছনেও তার অত্যন্ত বিতর্কিত ও সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে জানা গেছে।
একটি বিশেষায়িত এবং স্পর্শকাতর তদন্ত সংস্থা হিসেবে পিবিআই-এর ভাবমূর্তি এভাবে কতিপয় কর্মকর্তার জন্য ধূলিসাৎ হতে পারে না। হত্যা মামলার আসামি ছেড়ে দেওয়া, অফিস ফাঁকি দিয়ে জিম করা, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং অতীতের বিপুল অর্থ আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগে আসমা আরা জাহান এবং এসআই হায়দারের বিরুদ্ধে দ্রুত উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন এবং আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ।