বিশাল লেজার দিয়ে কৃত্রিম নক্ষত্র বানান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা কিন্তু কেন?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বড় টেলিস্কোপ ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (VLT) এখন একসঙ্গে সাতটি শক্তিশালী লেজার ব্যবহারের সক্ষমতা অর্জন করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মহাকাশের আরও পরিষ্কার ও নিখুঁত ছবি পেতে এসব লেজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরি (ESO) পরিচালিত এই টেলিস্কোপটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচুতে প্যারানাল পর্বতে অবস্থিত। রাতের আকাশে এখান থেকে লেজার ছুটে যেতে দেখলে দূর থেকে দৃশ্যটি অনেকটা কল্পবিজ্ঞানের কোনো ছবির মতো মনে হতে পারে।
তবে এসব লেজারের উদ্দেশ্য মহাকাশে কোনো বস্তু ধ্বংস করা নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কারণে দূরের নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোতে যে বিকৃতি তৈরি হয়, সেটি সংশোধন করতেই এগুলো ব্যবহার করা হয়।
বায়ুমণ্ডল কেন সমস্যা তৈরি করে?
মহাকাশ টেলিস্কোপের তুলনায় পৃথিবীর মাটিতে থাকা টেলিস্কোপের একটি বড় সমস্যা হলো বায়ুমণ্ডল। পৃথিবীর বায়ুস্তর পেরিয়ে আলো টেলিস্কোপের আয়নায় পৌঁছানোর সময় বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনশীল অবস্থার কারণে তা কিছুটা বিকৃত হয়ে যায়।
ফলে দূরের নক্ষত্রের ছবি অস্পষ্ট দেখা যেতে পারে। এ সমস্যা কাটাতে বিজ্ঞানীরা ‘অ্যাডাপটিভ অপটিকস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন।
এই প্রযুক্তিতে টেলিস্কোপের একটি বিশেষ আয়না অত্যন্ত দ্রুত নিজের আকৃতি পরিবর্তন করে বায়ুমণ্ডলের কারণে তৈরি হওয়া বিকৃতির বিপরীত সংশোধন করে। এর ফলে দূরের মহাজাগতিক বস্তুর ছবি অনেক বেশি পরিষ্কারভাবে পাওয়া সম্ভব হয়।
লেজার কীভাবে কৃত্রিম নক্ষত্র তৈরি করে?
অ্যাডাপটিভ অপটিকস ব্যবস্থার জন্য আকাশে একটি উজ্জ্বল নির্দিষ্ট রেফারেন্স পয়েন্ট প্রয়োজন। আকাশের যে অংশ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে সেখানে উপযুক্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র না থাকলে বিজ্ঞানীরা লেজারের সাহায্য নেন।
লেজারগুলো পৃথিবী থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার ওপরে থাকা সোডিয়ামসমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলীয় স্তরের দিকে ছোড়া হয়। লেজারের আলো সোডিয়াম পরমাণুকে উত্তেজিত করলে সেখান থেকে আলো নির্গত হয়। টেলিস্কোপের আয়না সেই আলো গ্রহণ করে।
এভাবে আকাশে একটি কৃত্রিম নক্ষত্রের মতো আলোকবিন্দু তৈরি করা হয়। এই কৃত্রিম নক্ষত্রকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে বায়ুমণ্ডলের বিকৃতি নির্ণয় ও তা সংশোধন করা সম্ভব হয়।
চার টেলিস্কোপে একসঙ্গে লেজার
VLT-এর চারটি প্রধান টেলিস্কোপ—Antu, Kueyen, Melipal ও Yepun—এখন একসঙ্গে লেজার ব্যবহারের সক্ষমতা পেয়েছে।
এর ফলে চারটি টেলিস্কোপ সমন্বিতভাবে কাজ করে আরও বড় একটি ভার্চুয়াল টেলিস্কোপের মতো মহাকাশ পর্যবেক্ষণ করতে পারে। একাধিক আয়নার তথ্য একত্র করার মাধ্যমে দূরের মহাজাগতিক বস্তুর সূক্ষ্ম বিবরণ আরও স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়।
এর আগে VLT-এর Yepun টেলিস্কোপে একসঙ্গে চারটি লেজার ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। প্রতিটি লেজারের শক্তি প্রায় ২২ ওয়াট এবং প্রতিটি রশ্মির ব্যাস প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার।
বিমান উড়ে গেলে কী হয়?
এত শক্তিশালী লেজার আকাশে ছোড়ার কারণে বিমানের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিমান পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের কাছাকাছি দিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা লেজার বন্ধ করে দেয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটিয়ে মহাবিশ্বের আরও সূক্ষ্ম ও পরিষ্কার ছবি পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
VLT ইতোমধ্যে সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহের প্রথম ছবি এবং মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরকে প্রদক্ষিণরত পৃথক নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অবদান রেখেছে।