ফ্লাইদুবাই হামলায় নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর নতুন বার্তা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাইয়ের FZ1073 ফ্লাইট ছিনতাইয়ের কথিত চেষ্টাকে ঘিরে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হামলাকারীর উদ্দেশ্য কী ছিল? ফ্লাইটের নাম প্রকাশ না করা ওই সহকারী পাইলট কেন ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেছিলেন, পরে যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়? তার হামলার লক্ষ্যই বা কী ছিল?
তবে বিষয়টি নিয়ে এখনো অস্পষ্টতা থাকলেও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যাত্রীদের স্বাগত জানানোর সময় থেকেই হামলাটিকে ইসরায়েলকে হেয় করার চলমান ‘প্রচার-প্রচারণার’ প্রায় অনিবার্য ফল হিসেবে তুলে ধরতে দ্রুত এগিয়ে যান।
যদিও হামলার উদ্দেশ্য নির্ধারণের জন্য এখনো সময় লাগবে বলে স্বীকার করেছেন নেতানিয়াহু, তারপরও তিনি ইরান ও তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর বিদেশে ইসরায়েলিদের ওপর হামলা আরও বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন। বৃহস্পতিবার তিনি দাবি করেন, ওই সহকারী পাইলট ‘ইসলামপন্থী উগ্রবাদী মতাদর্শে দীক্ষিত’ হয়েছিলেন—এমন তথ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ফ্লাইট ছিনতাইচেষ্টার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সাবেক ইসরায়েলি সরকারি উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এটি রাজনৈতিকভাবে কীভাবে এগোবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি।’
তিনি বলেন, ‘তবে এর একটি সুবিধা হতে পারে—নেতানিয়াহু যেসব বিষয় দেশের সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে দেখতে চান না, যেমন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার আসন্ন বার্ষিকী, সেগুলো সরিয়ে দিয়ে ইরানের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত থাকা একটি ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসা।’
এ সময় তিনি যুক্তরাজ্যে একটি মার্কিন বিমানঘাঁটির কাছে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার সঙ্গে তেহরানের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন।
ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ‘এটি নেতানিয়াহুর কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের জন্য নতুন গতি তৈরি করতে পারে—অর্থাৎ ইরানের ওপর আবারও জোরালো হামলা শুরু করা। একই সঙ্গে এটি নেতানিয়াহুর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যাগুলো থেকে মনোযোগ সরাতে পারে এবং চলতি সপ্তাহের শুরুতে দেওয়া তার সতর্কবার্তাগুলোকেও সঠিক বলে তুলে ধরার সুযোগ দিতে পারে।’
মঙ্গলবার নেতানিয়াহু একটি ভিডিও বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের আগে আমাদের শত্রুরা আমাদের ওপর হামলার চেষ্টা করবে—এমন ইঙ্গিত রয়েছে।’ তবে তার বিরোধীরা দ্রুত এই বক্তব্যকে প্রমাণহীন ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেন।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বিমান হামলার ঘটনাটিকে ‘জিহাদি সন্ত্রাসী হামলার চেষ্টা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনিও নেতানিয়াহুর আগের সতর্কবার্তার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও আমি যখন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা সতর্কতা ও সতর্কবার্তা দিই, তখন বিদেশে থাকা আমাদের শত্রু এবং দেশের ভেতরের অবগতিহীন সাবেক কর্মকর্তাসহ সবারই তা গুরুত্বের সঙ্গে শোনা উচিত।’
তবে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এই ঘটনার সঙ্গে নেতানিয়াহুর আগের সতর্কবার্তার কোনো যোগসূত্র থাকার বিষয়টি দ্রুত নাকচ করে দেন। বুধবার তিনি বলেন, ‘মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিরাপত্তা ব্রিফিংয়ে বিমান হামলার ঘটনার মতো কোনো কিছুরই উল্লেখ ছিল না।’
রাজনৈতিক লাভ
ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করা কিছু বিশ্লেষকের মতে, ফ্লাইট ছিনতাইচেষ্টার পর তার পদক্ষেপও সংকটের পরবর্তী পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে নিজের পক্ষে কাজে লাগানোর দীর্ঘদিনের পদ্ধতির অংশ।
ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কিংস কলেজ লন্ডনের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অহারন ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু এই ঘটনা থেকে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যাত্রীরা ইসরায়েলে অবতরণের পরপরই তাকে তাদের একজন ইসরায়েলি নায়কের সঙ্গে কথা বলতে দেখা গেছে, যিনি সহকারী পাইলটকে নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন।’
তবে ব্রেগম্যান মনে করেন না যে নেতানিয়াহু এর মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাবেন।
তিনি বলেন, ‘এতে তার কোনো রাজনৈতিক লাভ নেই। হামলাটি যেমন আমাদের সবাইকে বিস্মিত করেছে, তাকেও তেমনই বিস্মিত করেছে।’
ব্রেগম্যান বলেন, নেতানিয়াহুর একমাত্র সম্ভাবনা হতে পারে যদি ইরানের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো যোগসূত্র প্রমাণিত হয় এবং এর ফলে তেহরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সংঘাত আরও বাড়ানোর অবস্থান থেকে সরে আসছে বলে মনে হচ্ছে।
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘নিরাপত্তাব্যবস্থায় স্পষ্টতই একটি ত্রুটি ছিল, যা তদন্ত করা হবে। এটি আরেকটি ৯/১১-এর মতো ঘটনায় পরিণত হতে পারত। তবে কয়েকজন সাহসী যাত্রী এবং বিপুল পরিমাণ সৌভাগ্যের কারণে তা এড়ানো গেছে।’
নিপীড়নের অভিযোগ
বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ব্যর্থ বিমান দখলের চেষ্টার পেছনে কে ছিল তা বলার জন্য এখনো সময় হয়নি। তবে সহকারী পাইলটের কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘অপরিমেয় মাত্রার উগ্রতা ও ঘৃণার’ ফল হিসেবে উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসরায়েলের সমালোচনার সঙ্গে এসব অনুভূতির সম্পর্ক রয়েছে এবং এর পেছনে ইহুদিবিদ্বেষ কাজ করছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশে ক্ষোভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতানিয়াহুর নিপীড়নের শিকার হওয়ার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইসরায়েলের একাধিক হামলা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংস বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর হামলায় রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্টতার ব্যাপক অভিযোগও রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কয়েকটি দেশ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অবৈধ বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে নেতানিয়াহু বলেন, ইসরায়েলকে সাতটি যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি আরও একটি ‘অষ্টম ফ্রন্টে’ লড়াই করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এটি সত্যের জন্য যুদ্ধ। বিশ্বের গণমাধ্যমে এবং সবচেয়ে ক্ষতিকরভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই যুদ্ধ চলছে।’
তিনি আল জাজিরাসহ বিশ্বের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তরুণদের ‘ইসরায়েল, আমেরিকা ও পশ্চিমাদের ঘৃণা করতে মগজধোলাই’ করার অভিযোগ তোলেন।
আল জাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক নেতানিয়াহুর এই আক্রমণ প্রত্যাখ্যান করে একে আল জাজিরা ও এর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ‘ধারাবাহিক প্রচারণার’ সর্বশেষ উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছে। নেটওয়ার্কটির দাবি, গাজায় তাদের ১২ জন কর্মী নিহত হয়েছেন।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ফেলো ইয়োসি মেকেলবার্গ বলেন, ‘নেতানিয়াহুর সরকার এই হামলাকে জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করতে চাইবে।’
তিনি বলেন, ‘এটি ইসরায়েলের অনেক মানুষের মধ্যে থাকা নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে আরও জোরালো করবে। একই সঙ্গে ৭ অক্টোবরের পর থেকে চলে আসা মানসিক আঘাতকেও উসকে দেবে।’
তিনি আরও বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অভিযোগের কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের ভেতরে যে ভণ্ডামির অনুভূতি রয়েছে, এই ঘটনাটি সেটিও আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।