ইউরোপজুড়ে জেন-জি বিক্ষোভ: সংঘর্ষ, ধরপাকড় ও লুটপাটে উত্তাল তিন দেশ
মুখপত্র অনলাইন ডেস্ক
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়, সরকারি ব্যয় সংকোচন নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ থেকে আবারও রাজপথে নেমেছেন জেন-জিরা। ফ্রান্স, জার্মানি ও পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে পরিস্থিতি অনেকটা রণক্ষেত্রের রূপ নিয়েছে। বিক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, দেশে দেশে জেন–জিরা কেন ফুঁসে উঠেছে। ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসন্তোষ ঘিরে বিক্ষোভ মিছিলের পর রাজধানী প্যারিসসহ নানা শহরে সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলগুলোর বেশির ভাগই শান্তিপূর্ণ ছিল। এ ছাড়া মার্সেই শহরে মিছিলের শেষ দিকে উত্তেজনা দেখা দেয়। তবে রাত বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। ফ্রান্সে গত ১৭ অক্টোবর দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনার পর তৃতীয় সপ্তাহের মতো এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো। তবে আগের দুই শনিবারের তুলনায় গতকাল বিক্ষোভকারীর সংখ্যা কম ছিল। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ–সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার ৫ শতাধিক। ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান বিপণিবিতান সংলগ্ন সড়কের বড় একটি অংশ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। জার্মানিজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বড় ধরনের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর এ ঘটনা ঘটল। দিনভর শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হলেও সন্ধ্যায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ফ্রান্সে হ্যালোইন উৎসব চলাকালে শনিবার রাতে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের বড় ধরনের সংঘাত হয়েছে। ফ্রান্সে শহরে শহরে ব্যাপক ধরপাকড়ের ঘটনাও ঘটেছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এদিন দেশজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বিক্ষোভের সময় বিভিন্ন দোকান ও স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সরকারি হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় ৫৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই দিন দেশজুড়ে বিভিন্ন দোকান, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। কারণ, এখন দেশ পরিচালনা করছে একদল অযোগ্য মানুষ।
প্যারিসের পাশাপাশি লিওঁ, তুলুজ ও মার্সেই শহরেও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, যারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, তাদের কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। এতে চার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এএফপির এক সাংবাদিক জানান, ওই সময় পুলিশের ভ্যান ও বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত সদস্যরা সড়কটিতে কাউকে ঢুকতে দিচ্ছিলেন না।
ফ্রান্সের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিক্ষোভকারী জেরোম রদ্রিগেজ জানান, সাধারণ পরিবারগুলো যখন সামান্য অর্থের জন্য হিমশিম খাচ্ছে, তখন সরকার কোটি কোটি ইউরোর হিসাব নিয়ে ব্যস্ত। প্যারিসে বিক্ষোভকারী জেরোম রদ্রিগেজ বলেন, ‘যা-ই ঘটুক, ফ্রান্সের অর্থনীতির অবস্থা খারাপ।
এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্বলতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন, যার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা। ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থার দিন দিন অবনতি, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতির বিরুদ্ধে প্রথমে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয় শ্রমিক সংগঠনগুলো।
দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোয় মাখোঁ সরকার ব্যয় সংকোচনের চাপে রয়েছে। শুক্রবার ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ‘ফিচ’ ফ্রান্সের ঋণের ভবিষ্যৎ অবস্থান ‘নেতিবাচক’ হিসেবে চিহ্নিত করায় বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১২০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
এদিকে জার্মানিতে তরুণদের নেতৃত্বাধীন ‘জেনজি রেগেল্ট!’ সংগঠনের ডাকে ১০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গের মতো বড় শহরগুলোতে মিছিল সহিংসতায় রূপ নিলে পুলিশ জলকামান ও পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। প্যারিস থেকে বার্লিন কিংবা ওয়ারশ—এক রাতে তিন দেশের রাজপথ যেন রূপ নিল রণক্ষেত্রে।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ফ্রাঙ্কফুর্টে। সেখানে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালায় এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। হেসে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রোমান পোসেক জানান, হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং কিছু বামপন্থী উগ্রবাদী এই সহিংসতায় অনুপ্রবেশ করেছিল।
পোল্যান্ডেও সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের প্রধানকে বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের দাবি করলেও বিরোধীপক্ষ একে ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করছে। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো বিক্ষোভ হয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি বিদেশ সফর মাঝপথে বাতিল করে দেশে ফিরে আসেন। তিনি বরখাস্ত হওয়া আদালত প্রধানকে ট্রাইব্যুনাল ভবনে প্রবেশের সহায়তা করেন। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ, যারা আদালত ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সরকারের জন্য সংবেদনশীল এক সময়ে দেশজুড়ে এমন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের হাতে বিকল্প কমে আসছে।
ইতালিতেও বিক্ষোভের আঁচ লেগেছে। সেখানে হাজারো মানুষ শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে রাজপথে নেমেছেন। একই সঙ্গে সামরিক খাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়েরও বিরোধিতা করেছেন বিক্ষোভকারীরা। এ অবস্থায় সরকারি ব্যয় কমানোর চাপের মুখে পড়েছে মাখোঁর সরকার।