সহিংস আন্দোলনে যুক্তদের সরকারি চাকরির দরজা বন্ধ করল যোগী সরকার
মুখপত্র অনলাইন ডেস্ক
বিজেপিশাসিত উত্তর প্রদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নতুন ও কঠোর বিধি চালু করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন নির্দেশ জারি করে জানিয়েছে, হিংসাত্মক উপায়ে সরকার বদল বা ‘রেজিম চেঞ্জ’-এর মতো আন্দোলনে যুক্ত থাকা ব্যক্তিরা সরকারি চাকরির অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সম্প্রতি এলাহাবাদ হাইকোর্টের নির্দেশনার ভিত্তিতে নিয়োগ ও কর্মীবর্গ দপ্তরের মুখ্য সচিব এম দেবরাজ এই নতুন নির্দেশিকাটি প্রকাশ করেছেন। সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থার চাকরির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারবিরোধী আন্দোলনকে বিজেপি ‘নৈরাজ্য’ বলে চিহ্নিত করেছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ বলেছেন, তাঁরা বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে প্রেরণা পেয়েছেন। বলছে, হিংসাত্মক আচরণের মধ্য দিয়ে তারা সরকারের পতন ঘটাতে চাইছে। নতুন সরকারি নির্দেশিকাতেও রয়েছে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তাতে বলা হয়েছে, প্রচলিত ব্যবস্থাকে হিংসাত্মক উপায়ে পরিবর্তন করা যেসব সংগঠনের ঘোষিত লক্ষ্য, তেমন সংগঠনের সঙ্গে যোগ থাকা প্রার্থীরা সরকারি চাকরির অযোগ্য বলে প্রমানিত হবেন। যদিও সরকারি কর্তারা বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাইলে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।
নতুন এই নীতি অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী ২১ বছর পূর্ণ করার পর এবং চরিত্র যাচাইয়ের আগের তিন বছরের মধ্যে যদি এমন কোনো আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন, তবে তাকে সক্রিয় আন্দোলনকারী হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে রাজ্য সরকারের দাবি, কেবল রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে না। এছাড়া কারো বিরুদ্ধে তদন্তাধীন মামলা, এফআইআর, বা জুভেনাইল জাস্টিস আইনে বিচার চললে বা আপস-মীমাংসা ও বেকসুর খালাস পাওয়া প্রার্থীদের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্যতার নিয়ম কার্যকর হবে না। এমনকি চরিত্র যাচাইয়ের রিপোর্ট আসতে দেরি হলেও সাময়িকভাবে নিয়োগপত্র পাওয়া যাবে, তবে মিথ্যা তথ্য বা বিরূপ রিপোর্ট প্রমাণিত হলে তা বাতিল ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। তবে ওই তিন বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আচরণ ও মনোভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে এবং সেই বদলের অকাট্য প্রমাণ মিললে আবেদন পুনর্বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। কিংবা কারও নামে এফআইআর থাকলে বা কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলার তদন্ত চলমান থাকলে তাঁকে অযোগ্য বলে ধরা হবে না। সেসব ক্ষেত্রে প্রার্থীরা স্বঘোষণাপত্র বা সেলফ ডিক্লারেশন দিয়ে নিয়োগপত্র পেতে পারবেন।
নির্দেশিকাটি এমন এক সময়ে এল, যখন ১ নভেম্বর বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের রামলীলা ময়দান অভিযানকে কেন্দ্র করে রাজনীতি উত্তপ্ত। সমাজবাদী পার্টি (এসপি) ও কংগ্রেস এই নিয়মকে ব্রিটিশ আমলের ‘কালা বিধি’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সংবিধানস্বীকৃত গণতান্ত্রিক আন্দোলন করার অধিকার থেকে যুব সমাজকে বঞ্চিত করতেই সরকার এমন ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও ইন্ডিয়া জোটের নেতারা মনে করছেন, সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিভিন্ন আন্দোলনের প্রভাব রুখতে এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতা দমাতেই সরকার এই কৌশল নিয়েছে। সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, যোগী সরকার ব্রিটিশরাজের মতো আচরণ শুরু করেছে। ‘ভোটচুরির’ প্রতিবাদে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। এই নির্দেশিকা এমন সময় জারি করা হলো যখন বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট তাদের ১ নভেম্বরের প্রস্তাবিত রামলীলা ময়দান অভিযান সফল করতে ব্যস্ত। স্বাধীন ভারতে আন্দোলন করার অধিকার সংবিধান স্বীকৃত।
এদিকে, এই নির্দেশিকা জারির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর প্রদেশের ১১টি বিধান পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনী এলাকা বারানসির দুটি আসনসহ বিরোধী সমাজবাদী পার্টি আগের চেয়ে দুটি আসন বেশি জিতেছে। স্নাতক ও শিক্ষকদের ভোট হওয়া এই নির্বাচনে বিজেপির এমন পরাজয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষিত ভোটারদের মাঝে বিজেপির সমর্থন কমে যাওয়া এবং সরকারি চাকরির নতুন বিধিনিষেধ শাসক দলের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে। লক্ষণীয়, এবার দেশে চার রাজ্যের বিধান পরিষদের যে ২৮টি আসনে ভোট হলো, তার ভোটার ছিলেন স্নাতক ও শিক্ষকেরা। বিরোধীরা মনে করছে, ওই সমাবেশে যোগ দিতে উত্তর প্রদেশের যুব সম্প্রদায়কে অনাগ্রহী করে তোলা এই নির্দেশিকা জারির একটা বাড়তি কারণ।
সরকারি সূত্র অবশ্য জানিয়েছে, নির্দেশিকাটি কার্যকর হওয়ার আগে যারা চাকরি পেয়েছেন, তাদের চরিত্র নতুন করে যাচাই করা হবে না। তবে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিরূপ রিপোর্ট এলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হবে। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অরাজকতা সৃষ্টি বা জোরপূর্বক সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্য যারা আন্দোলনে লিপ্ত, তাদের চিহ্নিত করাই এই বিধির মূল লক্ষ্য।