তাহসিফ সাউরির মৃত্যু: দীপ রিমান্ডে, রেস্টুরেন্টের তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ
মুখপত্র অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বরখাস্ত হওয়া ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনার মামলার তদন্তে নেমে এক তরুণীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত 'নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার'-এ তাহসিফকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। অন্যদিকে তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া তার জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে নৌপুলিশ। নিহত তাহসিফের বাবার দায়ের করা হত্যা মামলায় দীপকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছিল।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও সিসিটিভি ফুটেজের সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ অক্টোবর রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বারে মোটরসাইকেলে করে পৌঁছান তাহসিফ ও তার এক বান্ধবী। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবেন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৪ থেকে ২৫ বছর বয়সী ওই তরুণী গেঞ্জি, প্যান্ট ও কেডস পরা ছিলেন এবং তার হাতে একটি সাদা পলিথিন ব্যাগ ছিল। এ সময় হেলমেট পরা অবস্থায় বন্ধু দীপও তাহসিফের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। রেস্টুরেন্ট ও বারে তরুণী এবং বন্ধু দীপের সঙ্গে তাহসিফ প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় কাটান। ওই তরুণীকে শনাক্ত ও জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে ঘটনার আগের সময়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসবে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তকারীরা। সুরতহাল করার সময় তাহসিফের ট্রাউজারের পকেটে থাকা আইফোনের সূত্র ধরে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা। তারা আশা করছেন, দ্রুত প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হত্যাকাণ্ড মামলা ও দীপের রিমান্ড
ঘটনার বিবরণে রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপের ডাকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দীপকে নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে। পরে শুক্রবার রাতে তাকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শুক্রবার গভীর রাতে অর্থাৎ রাত ১টার দিকে ডিএমপির উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম হেলাল। ওই মামলাতেই ডিটেকশন ও তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আটক থাকা দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়। শনিবার দুপুরে নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে দীপকে আদালত থেকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানান। পরে শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিমের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে।
নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার দাবি ও তদন্তে অসংগতি
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে আসামি দীপ দাবি করেছেন, ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফকে নিয়ে তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে পোশাক পরা দুজন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে তারা ভয় পেয়ে দুই দিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। সে সময় তাহসিফ তুরাগ নদীতে ঝাঁপ দেন বলে দীপ দাবি করেন। তবে ওই দুই পোশাকধারী পুলিশ কর্মকর্তা কারা ছিলেন, তারা কেন তাদের ধাওয়া করেছিলেন এবং তাহসিফ ঠিক কী কারণে নদীতে ঝাঁপ দিলেন কিংবা আদৌ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কি না—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। পুলিশের ধারণা, ওই এলাকায় মাদকসেবনের অভিযোগে টহল পুলিশ তাদের ধাওয়া করে থাকতে পারে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, এ ঘটনা তারা ছেড়ে দেবেন না।
নৌপুলিশ ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আসামি দীপ ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গেই ছিলেন। ফলে তাকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এই মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব হবে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার আভাস পাওয়া গেছে, তবে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু এলোমেলো ও অসংগতিপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। এসব তথ্য অন্যান্য প্রমাণ ও সিসিটিভি ফুটেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। রিমান্ড শেষে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানানো যাবে। তবে দীপের দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
আলামত উদ্ধার ও রাওয়ার দাবি
পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও উল্লেখ করেন, তাহসিফ বাসা থেকে বের হওয়ার পর কোন কোন স্থানে গিয়েছিলেন এবং কাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন, তার পুরো রুট ম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামতও তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সকল তথ্য এবং ফরেনসিক আলামত বিশ্লেষণ করে দ্রুততম সময়ে প্রকৃত তথ্য প্রকাশ্যে আনা হবে। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর সঠিক ও প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনসহ দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের কল্যাণ সংস্থা 'রাওয়া'। শনিবার দুপুরে সংগঠনটির প্রতিনিধিরা উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে শোকার্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং আইনি লড়াইয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এদিকে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজ।