এক সপ্তাহে ১,৭১৯ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির পথে, ঘুসের তীব্র অভিযোগ
অনলাইন ডেস্ক
⚡ ‘রকেট গতিতে’ এগোচ্ছে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া
মাত্র কয়েক কর্মদিবসেই হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবেদন যাচাই-বাছাই শেষ, যা নজিরবিহীন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
? শিক্ষকপ্রতি ঘুসের অভিযোগ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকসংখ্যা অনুযায়ী ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা, কোথাও আবার শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে লেনদেন হয়েছে।
? সরকারের বার্ষিক ব্যয় বাড়ছে ৬৭০ কোটি টাকা
নতুন করে এক হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হলে বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক খাতে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হবে বিপুল অঙ্ক।
? ‘ঘুসবাণিজ্য’ নিয়ে কানাঘুষা, প্রকাশ্যে নীরব সবাই
শতকোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ থাকলেও শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে ফিসফিসানি চললেও কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষপ্রান্তে এসে এক হাজার ৭১৯টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অস্বাভাবিক দ্রুততায় পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করায় শিক্ষা প্রশাসনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই এমপিওভুক্তির পেছনে সক্রিয় ছিল শত শত কোটি টাকার ঘুস লেনদেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন করে এমপিওভুক্তির লক্ষ্যে গত ১৪ জানুয়ারি অনলাইনে আবেদন আহ্বান করা হয়, যা শেষ হয় ২৫ জানুয়ারি। এই সময়ের মধ্যে তিন হাজার ৬১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দেয়। আবেদন গ্রহণ শেষ হওয়ার মাত্র আট কর্মদিবসের মধ্যেই সব তথ্য যাচাই-বাছাই শেষ করে এক হাজার ৭১৯টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যোগ্য ঘোষণা করা হয়। এরপর বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) তালিকাটি অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগে পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এত অল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠানের যাচাই শেষ করাটা নজিরবিহীন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুস লেনদেন হয়েছে। কোথাও আবার শিক্ষকপ্রতি ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি উঠেছে। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংখ্যা বেশি, সেখানে ঘুসের অঙ্কও ছিল বড়। কিছু ক্ষেত্রে লেনদেনের পরিমাণ অর্ধকোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তালিকাভুক্ত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থী নেই, শিক্ষার পরিবেশও নাজুক। বাস্তবে পাঠদান কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। তবুও অর্থের বিনিময়ে সেগুলো যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই এমপিওভুক্তি কার্যকর হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খাতে বছরে অতিরিক্ত ৬৭০ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হবে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে—৪৭১টি প্রতিষ্ঠানের জন্য বছরে লাগবে প্রায় ১৮৪ কোটি টাকা।
এছাড়া ৬২৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৯২ কোটি টাকা, ১৩৫টি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য ১০২ কোটি টাকা এবং ১৪৫টি উচ্চমাধ্যমিক কলেজের জন্য ব্যয় হবে প্রায় ১২৭ কোটি টাকা। স্নাতক (সম্মান) কলেজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২৫ কোটি টাকা এবং স্নাতক (পাস) কলেজে প্রায় ৩৯ কোটি টাকা।
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির কর্মকর্তাদের দাবি, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার বাস্তবায়ন হিসেবেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, সবকিছুই নিয়ম মেনেই করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি।
এদিকে সরকারের বিদায়ী সময়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থামছেই না। এর আগেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে একাধিক পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সর্বশেষ জানুয়ারিতে ২৪ জন উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দেওয়ার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এমপিওভুক্তি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ফিসফাস থাকলেও প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলছেন না। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় মাউশির আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা জড়িত এবং সবাই কোনো না কোনোভাবে সুবিধা পেয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট উপসচিব, সচিব ও শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।