ইয়েমেনের তাইজে কেন তীব্র হচ্ছে লড়াই?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার এবং ইরান-সমর্থিত হুথিরা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত এলাকা তাইজ গভর্নরেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তীব্র লড়াইয়ে জড়িয়েছে।
সৌদি আরব-সমর্থিত প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) প্রধান রাশাদ আল-আলিমি রোববার হুথিদের কাছ থেকে হারানো ভূখণ্ড পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে তাইজকে ঘিরে আরও লড়াই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়েও এখানে তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে।
পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, গত মাসে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বড় একটি অংশ দখলের পর হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার চেষ্টা করছে। সরকারের জন্য তাইজের লড়াই দেশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে কৌশলগত ও অস্তিত্বের লড়াই।
তাইজ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
তাইজ গভর্নরেট ইয়েমেনের সবচেয়ে জনবহুল অঞ্চল। এখানে প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ বসবাস করে। পশ্চিমের সমতল উপকূলীয় অঞ্চলটি লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। এর মধ্যে মোখা বন্দরনগরী এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালি রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে আকস্মিক ও দ্রুত অভিযানের মাধ্যমে হুথিরা এসব উপকূলীয় অঞ্চল দখল করে নেয়। এতে আশঙ্কা তৈরি হয় যে, গোষ্ঠীটি প্রণালির মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। এসব অঞ্চল তাইজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
গভর্নরেটের বড় একটি অংশ ইয়েমেনের পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত এবং এখনো দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধপূর্ণ। গভর্নরেটের রাজধানী তাইজ সিটি কয়েকটি পাহাড়ের মাঝখানে অবস্থিত এবং এটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এটি ইয়েমেনের অন্যতম জনবহুল শহর এবং দেশটির সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈধতার উৎস।
গভর্নরেটটি ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত উত্তরাঞ্চল এবং সরকার-নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণাঞ্চলের মাঝখানে অবস্থিত। হুথিদের অগ্রযাত্রা দক্ষিণের উপকূলীয় শহর এডেন থেকে সরকারি বাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি তৈরি করছে। এডেনেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত।
ইয়েমেনবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক ও নীতিবিষয়ক পরামর্শক ইব্রাহিম জালাল আল জাজিরাকে বলেন, পুরো ইয়েমেনের জন্য তাইজ শহরের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব অনেক।
জালাল বলেন, তাইজ শহরকে বিচ্ছিন্ন ও সংকুচিত করার হুথিদের প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো বাব আল-মানদেব পর্যন্ত লোহিত সাগর উপকূলে তাদের অর্জনগুলো সুরক্ষিত করা এবং একই সঙ্গে লাহিজ, এডেন ও দক্ষিণাঞ্চলের বড় একটি অংশের ওপর চাপ বাড়ানো।
তিনি আরও বলেন, হুথিরা বর্তমানে সাবেক উত্তর ইয়েমেনের সীমানা বরাবর তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ড বাড়াতে চাইছে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে তারা প্রতিরোধের ছোট ছোট ঘাঁটিগুলোও সরিয়ে দিতে চায়।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথি বাহিনী রাজধানী সানা দখলের পরপরই শুরু হওয়া যুদ্ধের সময় থেকেই তাইজ অন্যতম সবচেয়ে বেশি সংঘাতপূর্ণ শহর।
২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত হুথিদের ভয়াবহ অবরোধ ও হামলায় শহরটিতে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এ সময়ে সরকারি বাহিনী হুথিদের একাধিক হামলা প্রতিহত করেছে।
কারা এগিয়ে?
এখন পর্যন্ত তাইজের লড়াইয়ে কোনো পক্ষই স্পষ্ট জয় পায়নি। পর্যবেক্ষকেরা পরিস্থিতিকে অচলাবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আল জাজিরার প্রতিবেদক মোহাম্মদ আল-কাদি তাইজ শহর থেকে জানান, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সরকারি বাহিনী তাইজজুড়ে হুথিদের ঘাঁটি ও অবস্থান লক্ষ্য করে কয়েক ডজন বিমান হামলা চালিয়েছে।
হুথি যোদ্ধারা তীব্র কামান, ট্যাংক, মর্টার ও কাতিউশা রকেটের গোলাবর্ষণের আড়ালে শহরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে।
রোববার তাইজ সিটি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাহা আলি জানান, শহরের আশপাশে কামানের গোলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এ সময় বাসিন্দারা তাদের সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানান।
সেদিন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, ধুবাব এলাকায় একটি আবাসিক এলাকায় গোলা আঘাত হেনে ১৪ দিন বয়সী এক শিশুকে হত্যা করেছে। অন্যান্য হামলায়ও বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন।
সরকারি বাহিনীও শহরের আশপাশে অবস্থান নেওয়া হুথি বাহিনীকে লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করছে।
তাইজ সিটির উপকণ্ঠের গ্রামাঞ্চলেও এখন দুই পক্ষের সরাসরি লড়াই পৌঁছে গেছে। স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, তাইজের আশপাশের গ্রাম ও পার্বত্য এলাকায় হুথিদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা ঠেকাতে বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগেই লড়াই করছেন।