কম্বোডিয়ায় প্রতারণা ও পাচারের শিকার, ফিরছে চার বাংলাদেশির মরদেহ
নিউজ ডেস্ক
উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। লক্ষ্য ছিল কঠোর পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন এবং দেশে থাকা পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করা। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। কম্বোডিয়ায় গিয়ে নানা ধরনের প্রতারণা, পাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন চার বাংলাদেশি। তাদের মরদেহ দেশে ফিরছে কফিনবন্দি হয়ে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫ মিনিটে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে কম্বোডিয়া থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে ঝিনাইদহের সোহাগ আহাম্মেদ (২৩), চুয়াডাঙ্গার আসিফ খান (২৪) ও বগুড়ার জুয়েল হোসেনের (৫৩) মরদেহ। একই দিনে রাতের একটি ফ্লাইটে দেশে আসার কথা রয়েছে শাহনাজ তালুকদারের মরদেহ। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এ তথ্য জানিয়েছে।
জানা গেছে, সরকারি নিয়ম মেনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়েই তারা বিদেশে গিয়েছিলেন। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর কারও ভাগ্যে জোটে চীনা নিয়ন্ত্রিত সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে পড়ার ঘটনা, আবার কেউ কাজের প্রলোভনে প্রতারণার শিকার হন।
স্ক্যাম কম্পাউন্ডে প্রাণ গেল সোহাগের
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বারইপাড়া গ্রামের সোহাগ আহাম্মেদ ২০২৫ সালের এপ্রিলে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে কম্বোডিয়ায় যান। বিদেশ যাওয়ার খরচ জোগাতে তার পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পর সোহাগকে একটি চীনা নিয়ন্ত্রিত সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে পাচার করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন বন্দি অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হন তিনি। পরে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
সোহাগের বাবা বিল্লাল হোসেন জানান, ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে সুদে ও ঋণ করে প্রায় ৯ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। এখন ছেলেকে হারানোর পাশাপাশি সেই ঋণের চাপও পরিবারটির ওপর রয়েছে।
তিনি বলেন, মৃত্যুর দুই দিন আগে ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। তখনও তাকে স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
মরক্কো যাওয়ার কথা, শেষ ঠিকানা কম্বোডিয়া
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার শাহাপুর গ্রামের আসিফ খানও প্রতারণার শিকার হয়ে কম্বোডিয়ায় যান। তাকে মরক্কোতে কৃষিকাজ দেওয়ার কথা বলে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় দালাল জাকিরের মাধ্যমে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিদেশে যান আসিফ। তবে বিমানে ওঠার পর তার হাতে কম্বোডিয়ার ভিসা তুলে দেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই, ২৮ মার্চ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তার মৃত্যু হয়।
আসিফের বাবা জানান, ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। কৃষিকাজের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। বিদ্যুতের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও এমন কাজে যুক্ত হওয়ার পর দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়।
ছেলেকে হারিয়ে পরিবারটি এখন আর্থিকভাবেও চরম সংকটে পড়েছে বলে জানান তিনি।
ঋণ করে বিদেশ, দেশে ফিরছে নিথর দেহ
কম্বোডিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারানো অন্য দুজনের মধ্যে রয়েছেন বগুড়ার ৫৩ বছর বয়সী জুয়েল হোসেন ও শাহনাজ তালুকদার।
শাহনাজের মরদেহ বৃহস্পতিবার রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে। স্বামীকে হারিয়ে দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন তার স্ত্রী রেক্তা খাতুন।
তিনি জানান, তাদের একটি সন্তানের বয়স মাত্র পাঁচ মাস, অন্যটির তিন বছর। ঋণ নিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা খরচ করে স্বামীকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। এখন স্বামীকে হারানোর পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ ও সন্তানদের দেখাশোনা—দুটিই তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি ছাড়পত্রের পরও কেন পাচারের শিকার?
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে ১৬ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি কর্মী কম্বোডিয়ায় গেছেন।
তবে তাদের একটি অংশ দেশটিতে পৌঁছে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে। কেউ কেউ পরে সেখান থেকে উদ্ধার হয়ে দেশে ফিরেছেন। উদ্ধার হওয়া অনেকের কাছ থেকেই নির্যাতন ও বন্দিদশার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের এক কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে যাওয়া এসব কর্মীর পরিবারগুলো প্রিয়জনের জীবিত ফেরার অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছে কফিনবন্দি মরদেহ ফেরার মধ্য দিয়ে।
তার মতে, এসব ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের শোকের বিষয় নয়। এর সঙ্গে নিরাপদ অভিবাসন, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণা, মানবপাচার, সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড এবং সরকারি নজরদারির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িত।
সরকারি নিয়ম মেনে ছাড়পত্র নেওয়ার পরও কীভাবে বাংলাদেশি কর্মীরা পাচারের শিকার হচ্ছেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন যেন কোনো পরিবারের জন্য শেষ পর্যন্ত স্বজন হারানোর বেদনায় পরিণত না হয়, সেটিই এখন সবচেয়ে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।