বাব আল-মান্দাবে হুথিদের হটিয়ে অগ্রসর ইয়েমেনি বাহিনী
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করেছে। দেশটির পশ্চিম উপকূলে সরকারি বাহিনী ও ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হওয়ার মধ্যেই এ দাবি করা হলো।
এর পাল্টা হিসেবে হুথিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল অবকাঠামো ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানোর দাবি করেছে।
সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর নতুন অভিযান শুরু হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে হুথিদের বড় ধরনের অগ্রগতির পর। ওই সময় তারা লোহিত সাগরের উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা, কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশের অঞ্চল দখলে নেয়।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি রোববার ‘ডন অব ইয়েমেন’ নামে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেন। সরকারের দাবি, এ অভিযানের লক্ষ্য হুথিদের দখলে থাকা সব এলাকা পুনরুদ্ধার করা, যার মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে। হুথিরা ২০১৪ সাল থেকে রাজধানীটি নিয়ন্ত্রণ করছে।
কোথায় চলছে সবচেয়ে বেশি লড়াই?
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূল এবং তাইজের আশপাশে বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষ চলছে।
সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, সৌদি আরবের সহায়তায় তারা পপুলার রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের সঙ্গে মিলে তাইজের দক্ষিণে হাইফান এলাকায় আল-মানজারা, আল-আশারি ও ধিবান পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
এর আগে সরকারি বাহিনী মোখা ও ধুবাব এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশের কয়েকটি অবস্থান দখলের দাবি করে। সোমবার সৌদি বিমান হামলার সহায়তায় সরকারি বাহিনী মোখা শহরের উপকণ্ঠে পৌঁছালে হুথি যোদ্ধারা পার্বত্য এলাকার দিকে সরে যায় বলে সরকারি কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। পরে ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় শহরটির পতনের দাবি করে।
তবে হুথিদের এক সামরিক মুখপাত্র এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, যুদ্ধক্ষেত্রে হুথিদের অর্জন এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং প্রতিপক্ষের বিজয়ের দাবিকে তিনি ‘মনগড়া প্রচারণা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আল জাজিরা জানিয়েছে, সরকারি বাহিনী ঠিক কতটা এলাকা দখল করেছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
সংঘর্ষ ছড়িয়েছে হোদেইদা পর্যন্ত
লোহিত সাগরের উপকূল ধরে লড়াই আরও উত্তরে হোদেইদা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে শহরটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি জানিয়েছেন, হোদেইদা গভর্নরেটের হুথিদের কয়েকটি ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ নৌবাহিনী হামলা চালিয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে অস্ত্রের গুদাম এবং বিস্ফোরকবোঝাই নৌকা ও নৌমাইন সংরক্ষণের জায়গা ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
তার দাবি, দক্ষিণ লোহিত সাগরের নৌপথে পরিকল্পিত একটি হামলা ঠেকাতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে হুথিরা জানিয়েছে, আল-জাওফ গভর্নরেটের পূর্বাঞ্চলে সরকারি বাহিনীর ‘শত্রু’ শক্তিবৃদ্ধিকে লক্ষ্য করে তারা কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করলেও নির্দিষ্ট সংখ্যা জানায়নি তারা।
সৌদি আরবেও হামলার দাবি হুথিদের
ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর অভিযান চলার পাশাপাশি সৌদি আরবেও হামলা জোরদারের দাবি করেছে হুথিরা।
হুথি-সমর্থিত গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, রাবিঘের আরামকো তেল শোধনাগার, আবহা বিমানবন্দর এবং খামিস মুশাইত সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। নাজরান ও জাজান শহরের বিভিন্ন স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব দাবির সবগুলো নিশ্চিত করেনি। তবে সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় জাজানের কিং আবদুল্লাহ বিন আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও নাজরান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি হামলা হয়েছে। এতে তিনজন সামান্য আহত হয়েছেন।
পরে আবহা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করে হুথিরা। সৌদি আরব এখনো এ দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ
নতুন করে সংঘাত বাড়ায় আগে থেকেই বিপর্যস্ত ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, যুদ্ধ পুনরায় তীব্র হওয়ার পর ১ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সাম্প্রতিক লড়াইয়ে অন্তত ৯৫৯ জন নিহত এবং ৪ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
সংঘাতের কারণে দেশটির স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ডব্লিউএইচওর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের জরুরি বিভাগের পরিচালক আনেট হাইনজেলমান সতর্ক করে বলেছেন, নতুন করে সংঘাত বাড়ায় ইয়েমেনের দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সংঘাত বাড়ায় সৌদি আরবের আঞ্চলিক মিত্ররাও সক্রিয় হয়েছে। তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবে দ্রুত সামরিক বাহিনী ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা মোতায়েনে সম্মত হয়েছে।
আগস্টে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এই সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, পাকিস্তান বা তুরস্কের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এসেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী তাদের কাছ থেকে দখল হয়ে যাওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।