|
|
রবিবার, ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব মুখপত্র কর্তৃক সংরক্ষিত

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →

দুইবার বিধবা, সন্তান হারানো গাজার মায়ের বেঁচে থাকার গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ : ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:০৬ এএম
২৭ পঠিত
00:00
00:00
দুইবার বিধবা, সন্তান হারানো গাজার মায়ের বেঁচে থাকার গল্প
যুদ্ধের মধ্যে দুই সন্তানকে হারিয়েছেন নিসরিন তুমান। ছবি: আল জাজিরা

তিন বছর ধরে প্রতিরাতেই কান্নায় ঘুমাতে যান নিসরিন তুমান। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর একে একে যা হারিয়েছেন, সেসব স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।

৩৪ বছর বয়সে নিসরিন দুইবার স্বামী হারিয়েছেন। প্রথমবার ২০২৪ সালের জুনে তিনি হারান স্বামী ও দুই সন্তানকে। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে, পুনরায় বিয়ের আট মাস পর এবং অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দ্বিতীয় স্বামীকেও হারান তিনি।

গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে মধ্য গাজার নুসেইরাতে স্বামী সামি, ৩৫, এবং দুই সন্তান মাহমুদ ও লায়থকে নিয়ে সুখী ও স্থিতিশীল জীবন কাটাতেন নিসরিন। মৃত্যুর সময় তার সন্তানদের বয়স ছিল পাঁচ ও দুই বছর।

‘আমার একটি ঘর ছিল, পরিপূর্ণ একটি পরিবার ছিল। স্বামীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিল। আমরা একে অপরের বন্ধু ছিলাম,’ কান্না সামলাতে সামলাতে বলেন নিসরিন।

সবকিছু বদলে গেল

২০২৪ সালের ৮ জুন স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরছিলেন নিসরিন। তার আত্মীয়রা তখন খান ইউনিসের আল-মাওয়াসিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

‘আমরা বাড়িতে পৌঁছাই। শিশুরা রাস্তায় খেলছিল। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। আমি স্বামীর সঙ্গে ওপরতলায় ছিলাম। হঠাৎ খুব কাছ থেকে ভারী বোমাবর্ষণ ও গুলির শব্দ শুনতে শুরু করি।’

স্বামী সন্তানদের এবং তার ভাই-বোনদের সন্তানদের ঘরে নিয়ে আসতে বাইরে ছুটে যান। তখন বাড়িটিতে পরিবারের ২৫ জন সদস্য অবস্থান করছিলেন।

বিমান আকাশে উড়তে থাকায় পরিস্থিতি কী হয়েছে তা দেখতে তিনি আবারও বাইরে যান।

‘ওটাই ছিল তাকে আমার শেষ দেখা। পরে জানতে পারি, সেদিন এলাকায় উড়ে বেড়ানো একটি কোয়াডকপ্টার থেকে মাথায় গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়েছিল,’ বলেন নিসরিন।

কয়েক মিনিট পরও যখন বোমাবর্ষণ ও গুলির শব্দ চলছিল, তখন শিশুদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন নিসরিন। এর মধ্যেই একটি ইসরায়েলি বিমান তাদের বাড়িতে হামলা চালায়।

‘কয়েক মুহূর্তের জন্য আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। পরে ঘুম ভাঙার পর দেখি চারপাশ ঘন ধুলোয় ঢেকে গেছে। কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।’

‘ধীরে ধীরে ধুলো কমে এলে বুঝতে পারি আমাদের জায়গাটিতে বোমা হামলা হয়েছে। পরিবারের লোকজনের চিৎকার শুনতে পাই। রক্ত আর শরীরের বিভিন্ন অংশ দেখতে পাই। আমি চিৎকার করে বলতে থাকি, “আমার সন্তান, আমার সন্তান।”’

নিসরিন তার দুই সন্তানকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত ছিল, অন্যজনকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন ঘুমিয়ে আছে।

‘সেই মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, আমি তাদের হারিয়েছি। স্পষ্ট ছিল যে তারা মারা গেছে,’ বলেন তিনি। শোকে এতটাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন যে নড়াচড়া করতেও পারছিলেন না।

স্বামীর ভাই এসে শিশু দুটিকে তার কোলে তুলে দেন।

‘আমি কথা বলতে পারছিলাম না। একেবারেই কথা বলতে পারছিলাম না। শুধু নীরবে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। চারপাশের সবাই চিৎকার করছিল এবং কাঁদছিল।’

প্রায় দুই ঘণ্টা সন্তান দুটিকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন নিসরিন। এ সময় আহত সদস্যসহ পরিবারের অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িটির ভেতরে আটকা ছিলেন। বাইরে চলছিল গুলিবর্ষণ ও বোমাবর্ষণ।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির কাছে বারবার সাহায্যের আবেদন করার পর শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে একটি হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়।

নিসরিনের পরিবারের এই হত্যাকাণ্ড গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের অন্যতম রক্তক্ষয়ী দিনে ঘটে। ২০২৪ সালের ৮ জুন মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থীশিবিরে চার ইসরায়েলি জিম্মিকে উদ্ধারের জন্য ইসরায়েলি বাহিনী সামরিক অভিযান চালায়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর ওই চারজনকে জিম্মি করা হয়েছিল।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার ঘণ্টার বোমাবর্ষণে ৮৯টি বসতবাড়ি ও আবাসিক ভবন লক্ষ্যবস্তু করা হয়। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ওই দিনই ২৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৬৯৮ জন আহত হন।

নিসরিনের স্বামীর পরিবারের ১৮ জন সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন তার স্বামী ও দুই সন্তান, তার বোন সাবরিন (৩৬), শাশুড়ি, স্বামীর দুই ভাই ও তাদের সন্তানসহ পরিবারের আরও সদস্য।

কঠিন সিদ্ধান্ত

পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নিসরিন একাই গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় আল-মাওয়াসিতে পরিবারের তাঁবুতে ফিরে যান। সেখানে স্বামী ও সন্তানদের হারানোর শোক এবং মানসিক আঘাত নিয়ে দিন কাটাতে থাকেন।

এর সাড়ে চার মাস পর কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন তিনি। তার প্রয়াত বোনের স্বামী—যিনি নিসরিনের প্রথম স্বামীর ভাইও ছিলেন—তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন।

তিনি নিসরিনকে বিয়ে করে তাদের চার সন্তানকে দেখাশোনায় সাহায্য করতে বলেছিলেন। ওই চার শিশুও তাদের মাকে হারিয়েছিল।

‘শুরুতে আমি তীব্রভাবে আপত্তি জানিয়েছিলাম। আমি আর সংসার করতে বা বিয়ে করতে চাইনি,’ বলেন নিসরিন।

শেষ পর্যন্ত তিনি রাজি হন। কারণ তিনি তার প্রয়াত বোনের সন্তানদের দেখাশোনা করতে চেয়েছিলেন, বিশেষ করে সবচেয়ে ছোট শিশুটির, যার বয়স তখন মাত্র এক বছর।

দ্বিতীয় বিয়ের পেছনে কোনো রোমান্টিক অনুভূতি ছিল না—এ কথা নিসরিনও গোপন করেন না।

‘আমি আমার স্বামীকে হারিয়েছিলাম, আর সে তার স্ত্রীকে হারিয়েছিল। আমি আমার সন্তানদের হারিয়েছিলাম, আর চার সন্তান তাদের মাকে হারিয়েছিল,’ বলেন তিনি।

এই বিয়ের মাধ্যমে দুজন মানুষ তাদের হারানো স্বজনদের জায়গা পূরণের চেষ্টা করেন। নিজের সন্তানদের অনুপস্থিতির মধ্যে বোনের সন্তানদের কাছে কিছুটা সান্ত্বনা খুঁজে পান নিসরিন।

তবে নতুন জীবনও সহজ ছিল না। বিশেষ করে প্রথম কয়েক মাস ছিল কঠিন। নিসরিন তখনো প্রথম স্বামী ও সন্তানদের হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। একই সময়ে নতুন স্বামীর সঙ্গে নিজেদের নতুন সম্পর্কের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও চলছিল।

তাদের ব্যক্তিত্বের পার্থক্য এবং নতুন পরিস্থিতি নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। তবে ধীরে ধীরে তাদের জীবন কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। এমনকি আরেকটি সন্তান নেওয়ার কথাও ভাবতে শুরু করেন নিসরিন।

‘প্রতিদিন স্বপ্নে আমি আমার মৃত সন্তানদের দেখতাম। তাদের কথা ভাবতে ভাবতেই হারিয়ে যেতাম। তারা কখনোই আমার মন থেকে দূরে যায়নি,’ বলেন তিনি।

‘তাই মায়ের উৎসাহে আবার গর্ভবতী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আবারও মাতৃত্বের স্বাদ নিতে চেয়েছিলাম।’

দ্বিতীয়বার স্বামী হারানো

কিন্তু আট মাস পর, ২০২৫ সালের ৮ জুলাই, এমন একটি ঘটনার মুখোমুখি হন নিসরিন, যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি—দ্বিতীয় স্বামীকেও হারান তিনি।

‘মোহাম্মদ ঘুম থেকে উঠে সন্তানদের সঙ্গে নাশতা করেন। এরপর বলেন, একজন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কয়েক মুহূর্ত পরই আমরা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শুনি,’ বলেন নিসরিন।

এর কিছুক্ষণ পর এক প্রতিবেশী তাকে জানান, নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালের কাছে একদল মানুষের ওপর হামলায় মোহাম্মদ নিহত হয়েছেন।

নিসরিনের কাছে দ্বিতীয় স্বামীকে হারানোর ঘটনা প্রথমবারের চেয়েও বেশি কষ্টকর ছিল। কারণ তিনি ভেবেছিলেন, অবশেষে নতুন জীবনে কিছুটা স্থিরতা ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু আবারও তার জীবন পুরোপুরি বদলে যায়।

‘আমার মনে হয়েছিল, আমি আবার শূন্যে ফিরে গেছি,’ বলেন তিনি।

‘যে শিশুটি তখনো জন্ম নেয়নি, তার কথা ভাবছিলাম। আমার বোনের চার সন্তান, যারা এখন মা-বাবা দুজনকেই হারিয়েছে, তাদের কথা ভাবছিলাম। আর আমি যে নতুন শোকের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেটিও ভাবছিলাম।’

গর্ভাবস্থার বাকি সময়টা নিসরিনের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। মোহাম্মদ নিহত হওয়ার চার মাস পর একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি। মেয়েটির নাম রাখা হয় সিদরা।

শোকের মধ্যেই জন্ম

সিদরার জন্ম নিসরিনের কাছে আবারও ফিরিয়ে আনে তার হারানো দুই সন্তান, প্রথম স্বামী ও মোহাম্মদের স্মৃতি।

অক্টোবরে এক বছর পূর্ণ করতে যাওয়া সিদরা গত তিন বছরের দুঃখের মধ্যে নিসরিনের জীবনে ‘সামান্য সান্ত্বনা’ এনে দিয়েছে। তবে মেয়েটি বাবাকে ছাড়া বড় হবে—এই বিষয়টি তাকে কষ্ট দেয়।

‘আবার মা হতে পেরে আমি আনন্দ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই অনুভূতিটা ছিল গভীরভাবে অসম্পূর্ণ। সে ছিল আমার জন্য সামান্য সান্ত্বনা,’ বলেন নিসরিন।

এখন সিদরার যত্ন নেওয়াই নিসরিনের প্রধান অগ্রাধিকার।

‘আমি আরও বেশি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীরব থাকতে এবং মেয়েকে নিয়েই মনোযোগ দিতে পছন্দ করি,’ বলেন তিনি।

‘আমার সঙ্গে যা ঘটেছে, তার পর নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বা নতুন করে জীবন শুরু করার চেষ্টা করতে আমি ভয় পাই।’

বর্তমানে গাজায় পরিবারের বাড়িতে সিদরাকে নিয়ে বসবাস করছেন নিসরিন। তার প্রয়াত বোনের চার সন্তানকে দেখাশোনা করছেন তাদের দাদা। সময় পেলেই তিনি তাদের দেখতে যান। 

বিজ্ঞাপন | ব্যানার স্পট

আপনার ব্যবসার প্রসারে আমাদের জনপ্রিয় নিউজ ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিন!

বিজ্ঞাপন দিন →