হাসপাতালের জমিতে আড়ত, বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নিউজ ডেস্ক
ঢাকার আশুলিয়া-সংলগ্ন কামারপাড়া এলাকায় একটি প্রস্তাবিত বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমিতে কাঁচামালের আড়ত নির্মাণের কাজ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, হাসপাতাল নির্মাণের পরিবর্তে সেখানে বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে জমিটি স্থায়ীভাবে দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও নথিপত্র অনুযায়ী, জমিটি কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছিল। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা কমিটি ১৬৪ শতাংশ জমি প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজের জন্য বরাদ্দ দেয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রস্তাবিত নাম ছিল উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে জমিটি ঘিরে নতুন করে বিরোধ দেখা দেয়। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমানে বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মী জমিটিতে আড়ত নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত।
কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ১৯৭৭ সালে হরিরামপুর সাংস্কৃতিক সংসদ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় কয়েকজনের মতে, এলাকায় উন্নত চিকিৎসাসেবার অভাব থাকায় স্কুলের জমিতে মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
জমিতে আড়ত নির্মাণের চিত্র
প্রস্তাবিত হাসপাতালের জমিটি রাজধানীর তুরাগ থানার কামারপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে আশুলিয়ার দিকে যাওয়ার পথে সড়কের ডান পাশে অবস্থিত। গত ৪ অক্টোবর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জমিটিতে কাঁচামালের আড়ত নির্মাণের কাজ চলছিল। নির্মাণকাজের সুবিধার্থে সীমানাপ্রাচীরের বড় একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। জমির দেয়ালে দোকান বরাদ্দের বিজ্ঞাপনসংবলিত ব্যানারও টাঙানো ছিল।
সেখানে বাঁশ ও টিন দিয়ে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছিল। কাজ করছিলেন প্রায় অর্ধশত শ্রমিক। তবে নির্মাণকাজ কারা পরিচালনা করছেন, সে বিষয়ে শ্রমিকেরা কথা বলতে রাজি হননি।
এদিকে গত ৮ অক্টোবর জমিটির ছবি তুলতে গিয়ে হামলার পরিস্থিতির মুখে পড়েন প্রথম আলোর ফটোসাংবাদিক সাজিদ হোসেন। সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সেখানে গিয়ে কয়েকজনকে এক ব্যক্তিকে মারধর করতে দেখেন। পরে ড্রোন দিয়ে ছবি তোলার সময় নির্মাণকাজের তদারকিতে থাকা কয়েকজন তাঁর দিকে এগিয়ে এলে তিনি মোটরসাইকেলে করে স্থান ত্যাগ করেন।
আগেও বসানো হয়েছিল ট্রাকস্ট্যান্ড
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একই জমিতে ট্রাকস্ট্যান্ড স্থাপনের অভিযোগ ওঠে তুরাগ থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে।
জহিরুল ইসলাম জানান, তিনি প্রায় তিন মাস সেখানে ট্রাকস্ট্যান্ড পরিচালনা করেছিলেন এবং এ সময় স্কুল কর্তৃপক্ষকে অর্থও দিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, ওই উদ্যোগে তিনি একা ছিলেন না; আরও একটি পক্ষ যুক্ত ছিল। পরে সমালোচনার মুখে ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে নেওয়া হয়।
বর্তমানে রফিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান সেখানে আড়ত নির্মাণ করছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি জমিটি ভাড়া নিয়ে কাজ করছেন। এ জন্য মাসে ১৬ লাখ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, জমিটি ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে। তাঁদের দাবি, জহিরুল ইসলাম নিজেও জমিটি ভাড়া নেওয়ার জন্য দরপত্রে অংশ নিয়েছিলেন। কাজ না পেলেও পরে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা হয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।
স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ
কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি মোস্তফা জামান। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্যসচিব হিসেবেও পরিচিত। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, জমিটি ভাড়া দেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তফা জামান বলেন, বিষয়টি নিয়ে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাঁর নিজের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ফোনকল কেটে দেন।
কলেজের অধ্যক্ষ খুরশীদ জাহানও জমিটি ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন। কেন হাসপাতালের জন্য নির্ধারিত জমিতে আড়ত নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্কুলের স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর স্থানীয় বিএনপি নেতা বিপ্লব হোসেনের একটি ফেসবুক লাইভ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। ভিডিওতে তাঁকে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের নির্মাণকাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে দেখা যায়। ভিডিওতে জহিরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজনকে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে।
জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন
নথিপত্র অনুযায়ী, জমিটি ২০১০ সালে মেডিক্যাল কলেজের জন্য হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান মালিকানা ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মিরপুর রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. বায়েজিদ সরদার প্রথম আলোকে জানান, সরকারি রেকর্ডে জমিটি এখনো উত্তরা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের নামে রয়েছে। তবে বাস্তবে কারা জমিটি দখলে রেখেছে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
এ অবস্থায় হাসপাতালের নামে রেকর্ডভুক্ত জমি স্কুল কর্তৃপক্ষ কীভাবে ভাড়া দিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের কয়েকজন সদস্য। তাঁদের অভিযোগ, ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে জমিটি বাণিজ্যিক কাজে লাগানো হচ্ছে। জমিটির বর্তমান বাজারমূল্য ১০০ কোটি টাকার বেশি বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
তবে জমির মালিকানা, ভাড়া দেওয়ার বৈধতা এবং আড়ত নির্মাণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নির্ধারণে সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতাল না হওয়ায় হতাশ স্থানীয়রা
কামারপাড়া এলাকায় উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, প্রস্তাবিত মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চালু হলে আশপাশের মানুষ সহজে চিকিৎসাসেবা পাবেন।
গত ৪ অক্টোবর জমিটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুকুল আহমেদ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, সেখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে বলে তিনি জানতেন। হাসপাতাল হলে এলাকার মানুষের উপকার হতো। কিন্তু বর্তমানে আড়ত নির্মাণের কাজ দেখে তাঁর মনে হচ্ছে, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা কমে গেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের ফলে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আরও পিছিয়ে যেতে পারে। তাই জমিটির প্রকৃত মালিকানা, ভাড়া দেওয়ার বৈধতা এবং প্রস্তাবিত হাসপাতালের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট অবস্থান চান তাঁরা।