উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাতে নতুন বিপজ্জনক মুহূর্ত, রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালিদ বিমানবন্দরে শনিবারের হামলা মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে নতুন করে বিপজ্জনক মোড় তৈরি করেছে।
এ হামলার জন্য সৌদি আরব প্রস্তুত ছিল না।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা জোরদার করেছে হুথিরা। তবে গত কয়েক দিনের হামলায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, বিশেষ করে রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দর, লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সহজেই ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে হুথিরা।
হামলায় সৃষ্ট ভৌত ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হলেও স্থিতিশীল ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে সৌদি আরবের যে ভাবমূর্তি রয়েছে, তা বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে।
বিমানবন্দরে হামলার পাশাপাশি হুথিরা লোহিত সাগরের উপকূল এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিয়ে ঝুঁকি আরও বেড়েছে। তবে ইয়েমেনের সরকার জানিয়েছে, তারা প্রণালিটি ‘নিরাপদ করেছে’।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, যাদের সমর্থন দিচ্ছে সৌদি আরব, এবং ইরান-সমর্থিত হুথিদের মধ্যে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। এ সংঘাতে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইয়েমেন বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে পড়েছে।
এটি একটি জটিল ও প্রায়ই বিভ্রান্তিকর ভূরাজনৈতিক সংঘাত। হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা ও উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টি ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার বৃহত্তর উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে।
আল-কায়েদার বিদ্রোহের পর সবচেয়ে বড় হুমকি
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি আল-কায়েদার বিদ্রোহের পর এই প্রথম সৌদি আরব এত বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে।
সৌদি সরকার কার্যকর জনসম্পৃক্ততা ও জনসমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছিল। এরপর তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিসর ও ইয়েমেনে শাসকদের পতন ঘটানো আরব বসন্তের গণঅভ্যুত্থানগুলোও সামাল দেয় দেশটি।
এমনকি গত মার্চে রিয়াদে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাও কিছুটা বিরক্তি প্রকাশের মধ্য দিয়ে মোকাবিলা করেছিল সৌদি আরব।
কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শক্তিশালী বিমানবাহিনী রয়েছে সৌদি আরবের। দেশটি হুথিদের অবস্থান লক্ষ্য করে ব্যাপক বিমান হামলাও চালিয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও প্রতিপক্ষ বাহিনী ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা, বিশেষ করে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
তবে হুথিরা জানে, কোথায় আঘাত করলে সৌদি আরব সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বে। আর তা হলো দেশটির অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলো।
ইরান-সমর্থিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হুথিরা। লোহিত সাগরের জিজান থেকে শুরু করে খুরাইসের পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনা পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে বিস্ফোরক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে তারা।
লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের গুরুত্বও বেড়েছে। কারণ, উপসাগরের অপর প্রান্তে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধ বন্ধে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা চালানো হুথিদের চাপ প্রয়োগের আরেকটি কৌশল। এসব হামলায় বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি হয়, যা তেহরানের জন্য দর-কষাকষির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্র কি যুদ্ধে জড়াবে?
সেপ্টেম্বরের শুরুতে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, ইয়েমেন সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না। তবে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে। পরে ওয়াশিংটন নিশ্চিত করে, তারা সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে এবং দেশটিতে সামরিক বিশেষজ্ঞ মোতায়েন করেছে।
তবে রিয়াদে সর্বশেষ হামলার পর পরিস্থিতি নতুন দিকে মোড় নিতে পারে। ওই হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবারের হামলাকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের সঙ্গে মিলে সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এইমাত্র সাম্প্রতিক হামলার খবর পেয়েছি। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আমরা খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিই।’
তবে আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা এখন কম বলেই মনে হচ্ছে।
২০২৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সময় ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের তিনটি অমীমাংসিত সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র জড়িত রয়েছে—গাজা, লেবানন ও ইরানে।
এরপর ইয়েমেনেও নতুন করে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে তা মার্কিন ভোটারদের মধ্যে ভালোভাবে গৃহীত হওয়ার সম্ভাবনা কম।