শুল্কযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার সম্পর্কে ফাটল, বাড়ছে বিভাজন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে কানাডা। এতে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও বিভক্ত হয়ে পড়ছে বলে সীমান্তবর্তী এলাকার অনেক মার্কিন নাগরিক মনে করছেন। তারা আশা করছেন, এই বাণিজ্যযুদ্ধ যেন দুই দেশের সম্পর্কের স্থায়ী বিচ্ছেদে রূপ না নেয়।
শুল্কযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে, কানাডীয়রা নিজেদের দেশেই অর্থ ব্যয় করায় সীমান্ত পারাপার কমে গেছে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পদক্ষেপ নিয়ে অনেক কানাডীয় নাগরিকের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
এই বাণিজ্যযুদ্ধ শুধু ব্যবসায়িক সম্পর্ককেই হুমকির মুখে ফেলেনি, কখনো কখনো যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর সীমান্তে বসবাসকারী মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে।
ওয়াশিংটনের সীমান্তবর্তী ব্লেইনে ফুল ও উপহারের দোকান এবং ভাড়ার সম্পত্তির ব্যবসা করেন গুরদীপ বেইন্স। তিনি বলেন, ‘এটি সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এর প্রভাব পড়েছে। মানুষের গাড়ির টায়ার পর্যন্ত কেটে দেওয়া হয়েছে।’
ব্লেইন কর্তৃপক্ষ এখন মেনে নিয়েছে যে শহরটি কানাডীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভর করতে পারে না। তাই সিয়াটলের মতো শহর থেকে আরও বেশি দেশীয় পর্যটক আকর্ষণের চেষ্টা করছে তারা।
বেইন্স জানান, গত এক বছরে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছিল। তবে এখন নতুন করে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক হয়তো আর কখনো পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরবে না। এমনকি কানাডায় বসবাসকারী তার নিজের আত্মীয়রাও আগের তুলনায় কম আসছেন।
মঙ্গলবার পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে কানাডার পাল্টা শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর ফলে সানস্ক্রিন, ইস্পাত ও চুলা থেকে শুরু করে প্রায় ৬৫০ ধরনের আমদানি পণ্যের ওপর কানাডীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া শুল্ক ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর কানাডা এই পদক্ষেপ নেয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কানাডীয় পণ্যের ওপর আরও ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত মাসে বলেছিলেন, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের মতো বিবেচনা করা ‘কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না’।
এর দুই দিন পর ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে অন্টারিও হ্রদের নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ রাখার উদ্যোগ নেন। বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঠকাচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেন। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, শুল্ক এড়াতে কানাডীয় ব্যবসাগুলো সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসবে।
কানাডার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য বিরোধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে ইপসসের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি তিনজন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে দুজন মনে করেন, কানাডার সঙ্গে সমঝোতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরও আগ্রহী হওয়া উচিত। রিপাবলিকানদের মধ্যেও প্রায় অর্ধেক এমন মত দিয়েছেন।
বাণিজ্যযুদ্ধের জন্য দায়ী কে—এ প্রশ্নে ৪৬ শতাংশ মার্কিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। বিপরীতে মাত্র ১২ শতাংশ কানাডাকে দায়ী করেছেন। তবে জরিপে দেখা যায়, মাত্র অর্ধেক মার্কিন নাগরিক বাণিজ্যযুদ্ধ সম্পর্কে অবগত ছিলেন।
সীমান্তবর্তী তিনটি অঙ্গরাজ্যের ছোট ব্যবসার মালিক ও স্থানীয় কর্মকর্তারা সোমবার জানান, সর্বশেষ সম্পর্কের অবনতির আগে তারা কানাডীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে সামান্য উন্নতি দেখতে শুরু করেছিলেন।
ভারমন্টের সাউথ হিরোর স্নো ফার্ম ভিনইয়ার্ড অ্যান্ড ডিস্টিলারি পরিচালনা করেন ডেভ লেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরছে। কিন্তু দুই দেশের নতুন দফার শুল্ক সম্পর্কের ওপর আবারও প্রভাব ফেলছে।’
লেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক তার ব্যবসার আর্থিক অবস্থায় ইতোমধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কানাডা থেকে আমদানি করা প্রতিটি খালি বোতলের দাম প্রায় ৭ থেকে ৮ ডলার বেড়েছে।
এখন মদ বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি কানাডীয় ক্রেতারাও দূরে থাকছেন। ফলে ওয়াইন, ব্র্যান্ডি, জিনসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি দাম বাড়ানোর পরিবর্তে বিজ্ঞাপনের খরচ কমিয়েছে।
তবে লেন আশা করছেন, কানাডার সঙ্গে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হবে এবং তার ব্যবসাও ঘুরে দাঁড়াবে। তার মতে, সীমান্তবর্তী দুই দেশের সংস্কৃতি এতটাই পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যে সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম।
ভারমন্টের বাসিন্দারাও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি কানাডীয়দের ক্ষোভকে বুঝতে পারছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সমর্থনও করছেন।
গত বছর ভারমন্টের বার্লিংটন শহর সাময়িকভাবে শহরের কেন্দ্রের পথচারীদের জন্য নির্ধারিত একটি সড়কের নাম বদলে ‘রু কানাডা’ রেখেছিল। কানাডার প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়। লেন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এখনো কানাডার পতাকা এবং কুইবেকের পতাকা দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখন খুব অদ্ভুত একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তবে আমরা এটি কাটিয়ে উঠব।’
অন্যদিকে, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত নর্থ ডাকোটার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। অঙ্গরাজ্যটি নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ কানাডায় রপ্তানি করে।
কানাডা সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত অঙ্গরাজ্যটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর গ্র্যান্ড ফর্কসে মেয়র ব্র্যান্ডন বচেনস্কি বলেন, কৃষিখাত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। স্থানীয় কৃষকেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম হলেও নতুন পাল্টা শুল্ক নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।
তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ওই এলাকা ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিল। মেয়র জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় অংশ এখনো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছেন।
স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ব্যারি উইলফার্ট বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেসব দেশের বড় বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিন্যাসের জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব কৌশল রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী আসবেন-যাবেন, কিন্তু কানাডা সবসময় আমাদের প্রতিবেশী থাকবে। গ্র্যান্ড ফর্কসে আমাদের প্রতিবেশীরা যখন বেড়াতে আসবেন, আমরা তাদের সবসময় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাব।’