ইয়েমেন যুদ্ধ: সরকারি বাহিনীর অগ্রগতির দাবি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা সব এলাকা পুনর্দখলে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। কয়েক বছর ধরে অনেকটা স্থবির থাকা ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে লড়াই তীব্র হওয়ার পর নতুন করে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
ইয়েমেন সরকারের নির্বাহী সংস্থা প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি এই ঘোষণা দিয়েছেন। দেশটির লোহিত সাগর উপকূল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের আশপাশে কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র লড়াই ও হুতিদের অগ্রসর হওয়ার পর এ ঘোষণা এলো।
সোমবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, তারা দেশটির রাজধানী সানার দিকে ‘কৌশলগত’ অভিযান শুরু করেছে। ২০১৪ সাল থেকে সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এর আগে ইয়েমেনি বাহিনী জানায়, তারা বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে দেশটির পশ্চিম উপকূলের ধুবাব জেলা পুনর্দখল করেছে। তবে হুতিরা এ দাবি অস্বীকার করেছে।
ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত হুতিদের সঙ্গে ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর সংঘাত ২০২২ সালের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি জুলাইয়ে ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আবারও বিস্তৃত হয়েছে। এরপর থেকে এক লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
গত মাসে হুতিরা দ্রুত অভিযান চালিয়ে লোহিত সাগরের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার উপকূল এবং বাব আল-মান্দাবের আশপাশের এলাকা দখলে নেয়। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্ত করা সরু এই জলপথ আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সোমবার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুতিদের পরাজিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আরও সহায়তা চেয়েছেন। তিনি বলেন, ইয়েমেনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা ‘বিশ্বের স্বার্থে’ প্রয়োজন।
লড়াইয়ের সর্বশেষ অবস্থা
ইয়েমেনের সরকারি সেনাবাহিনী সোমবার জানিয়েছে, সাদা, আল-জাওফ ও তাইজ প্রদেশ এবং দেশটির পশ্চিম উপকূলে ১ হাজার ১২২টি সামরিক অভিযানে ১ হাজার ৭৪৭ জন হুতি যোদ্ধাকে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে।
সামরিক মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নুজাইলি বলেন, এসব অভিযানে হুতিদের কামান ও ক্ষেপণাস্ত্রের অবস্থান, সামরিক স্থাপনা, সরবরাহ ব্যবস্থা, রসদ ও কমান্ড সেন্টার লক্ষ্য করা হয়েছে।
তিনি জানান, বিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্নাইপার ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযানে ৩৬৪টি সামরিক ও লজিস্টিক যান ধ্বংস বা অচল করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে হতাহত ও সরঞ্জাম ধ্বংসের এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ইয়েমেন সরকার জানিয়েছে, তাদের বাহিনী লোহিত সাগরের উপকূলে ধুবাবের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে এবং সানা দখলে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে।
দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মারিব প্রদেশেও সোমবার সংঘাত বেড়েছে। একটি সামরিক সূত্র জানায়, সরকারি বাহিনী প্রদেশটির উত্তরে রাগওয়ান ফ্রন্টে হুতিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে হুতিদের অবস্থান ও রসদ সরবরাহে বিমান হামলাও চালানো হয়।
সূত্রটি জানায়, মারিবের কাছে হেলান পাহাড়ের আশপাশে হুতিদের অবস্থান, একটি অস্ত্রের গুদাম এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক রসদ ও শক্তিবৃদ্ধির ওপর হামলা চালানো হয়েছে।
রোববার সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, তাইজ ও তোর আল-বাহা ফ্রন্টের আশপাশে হুতিদের রসদ ও শক্তিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে তারা ৯৭টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় যুদ্ধবিমান, ড্রোন, কামান, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্নাইপার ব্যবহার করা হয়েছে।
ইয়েমেন সরকার কী ঘোষণা করেছে?
রোববার রাশাদ আল-আলিমি জানান, হুতিদের দখলে থাকা এলাকা পুনরুদ্ধার এবং পুরো দেশে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, হুতিদের কাছ থেকে দেশকে মুক্ত না করা পর্যন্ত অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্যান্য সামরিক ইউনিটকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্সকে সামরিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এর আগের ৪৮ ঘণ্টায় হুতিরা তাইজের কাছে কৌশলগত কয়েকটি পাহাড়ি অবস্থানে সরকারি ও স্থানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হয়েছে। তারা দক্ষিণ উপকূলের শহর তাইজের সঙ্গে এডেনকে যুক্ত করা শেষ গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির দিকেও এগিয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে চার নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, হুতিরা তাইজ ও ইয়েমেন সরকারের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথ বিচ্ছিন্ন করেছে।
২০১৪ সাল থেকে হুতিরা সানা এবং ইয়েমেনের জনবহুল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। পরের বছর সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন করে সামরিক জোটের নেতৃত্বে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করে। তবে হুতিদের সেখান থেকে সরাতে পারেনি।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল। তবে চলতি বছর আবারও সংঘাত তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক লড়াইয়ের প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে লোহিত সাগর উপকূল ও তাইজ।
ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ইব্রাহিম জালাল বলেন, হুতিদের মোকাবিলা করা সরকার ও তার মিত্রদের জন্য কঠিন হবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সহায়তায় হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, ড্রোনের নির্ভুলতা এবং সামরিক সক্ষমতা বেড়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধে নিজেদের সময়সূচি অনুযায়ী যুক্ত হয়ে হুতিরা তেহরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এ নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে আইআরজিসি হরমুজ প্রণালি থেকে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাবে চাপ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
সৌদি আরব কী বলেছে?
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে অব্যাহত সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সৌদি আরব।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দক্ষিণ লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবে নৌ চলাচলের ওপর হুতিদের হুমকি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে।
তিনি বলেন, নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সৌদি আরবের ‘সহজাত অধিকার’ রয়েছে এবং হুতিদের অভিযান ঠেকাতে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকারও দেশটির রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রিয়াদ, আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান, নাজরান, তাইফ ও ইয়ানবুতে হামলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।