ভারতে ‘ককরোচ’ আন্দোলনে কি মোদির নির্বাচন কমিশন প্রধানের পতন?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
শুক্রবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রীয় অংশ অনেকটা জনশূন্য নগরীতে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পুলিশ শত শত বিক্ষোভকারীকে আটক করে। এ সময় গত গ্রীষ্মে দেশটির শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করা ‘ককরোচ’ আন্দোলন বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়ে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি জানায়।
সরকার কেন্দ্রীয় দিল্লির দিকে যাওয়া মেট্রোরেল স্টেশনগুলো বন্ধ করে দেয় এবং ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত করে। বিপুলসংখ্যক সরকারি বাহিনী মোতায়েন করে পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও জন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। মাত্র দুই মাস আগে এই জন্তর মন্তরেই তরুণদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
মধ্য ভারতের শহর গোয়ালিয়রের ২৪ বছর বয়সী সংগীতশিল্পী সৌরভ যাদব বিক্ষোভে যোগ দিতে রাতভর বাসে করে দিল্লিতে আসেন। রাজধানীতে এটিই ছিল তার প্রথম সফর। ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ডাকে আয়োজিত এই বিক্ষোভে বিভিন্ন বিরোধী দল ও ইউনিয়নও যোগ দেয়।
তবে বিক্ষোভস্থলের দিকে যাওয়ার সময় হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা থাকা অবস্থাতেই দুই পুলিশ সদস্য তাকে ধরে নিয়ে যান। পুলিশ ভ্যানে বসে বিস্মিত যাদব আল জাজিরাকে বলেন, “এই সরকার নির্বাচন পরিচালনা করছে। একটু ভাবুন, তাদের ক্ষমতা পাওয়ার একমাত্র বিষয়টিই যদি নিয়ন্ত্রিত হয়!”
তিনি বলেন, “আমরা শুধু গণতন্ত্রের অভিনয় করছি। এভাবে আর ভান করে যেতে পারি না।”
আগামী কয়েক দিনে ‘ককরোচ’ আন্দোলন ভারতের আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। শুক্রবার দেশটির আর্থিক রাজধানী মুম্বাইয়েও বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রীকে সরাতে সফল হওয়া তরুণ আন্দোলনের নেতারা এবার নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। তাদের লক্ষ্য এখন মোদি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমলা।
‘জ্ঞানেশ কুমারকে চলে যেতে হবে’
বিতর্কিত কিছু নীতির কারণে সমালোচকদের অভিযোগ, কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। এমন অভিযোগের মধ্যে ভারতের নির্বাচন পরিচালনাকারী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন নিয়ে গত সপ্তাহে নতুন তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তথ্যভান্ডারে চলমান পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে অপর দুই নির্বাচন কমিশনারের উদ্বেগকে প্রায়ই অগ্রাহ্য করেছেন ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমার।
নির্বাচন কমিশন ওই প্রতিবেদনকে খণ্ডন করেনি। তবে তথ্য প্রকাশের পর কমিশন জানিয়েছে, অপর দুই নির্বাচন কমিশনারের উত্থাপিত উদ্বেগগুলো সমাধানে তারা কাজ করছে।
এই তথ্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন ভারতের বিরোধী দলগুলো কয়েক মাস ধরে নির্বাচন কমিশনের কথিত ‘নাশকতামূলক’ কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনী সুবিধা পেতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচন কমিশনকে প্রভাবিত করছে।
গত বছরের জুন থেকে কমিশন বিভিন্ন রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন ও হালনাগাদ করছে। এই প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এতে ভারতের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ, সংখ্যালঘু ও সমাজের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘ককরোচ’ আন্দোলনের নেতারা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের ক্রমবর্ধমান দাবির সঙ্গে দ্রুত নিজেদের যুক্ত করেছেন। তারা এটিকে ‘গণতন্ত্র রক্ষার শেষ ডাক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী নির্বাচন কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার করার আহ্বান জানিয়েছেন।
কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) জ্যেষ্ঠ নেতা এন সাই বালাজি বলেন, “মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে সন্দেহ করে আসছে এবং বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তুলে ধরেছেন।”
তিনি আল জাজিরাকে বলেন, “এবার আমাদের কোনো আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন নেই। আমাদের শুধু রাস্তায় বের হতে হবে। আর মূল দাবির বিরোধিতা করার মতো কেউ থাকবে না—জ্ঞানেশ কুমারকে চলে যেতে হবে।”
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে হওয়া তরুণদের আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে ভারতের গভীরভাবে বিভক্ত সমাজে শিক্ষাকে একটি ঐক্যের বিষয় হিসেবে তুলে ধরার ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয়।
বালাজি বলেন, “তাহলে এটি সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ইস্যু। কে ভোট দিতে পারবে আর কে পারবে না, তা নির্ধারণ করার জন্য একজন আমলা কে?”
তিনি বলেন, “বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সর্বসম্মত ধারণা রয়েছে যে নির্বাচন নিয়ন্ত্রিত ও সাজানো হচ্ছে।” তার ভাষায়, কুমার নির্বাচন কমিশনের প্রধান পদে থাকলে “তথাকথিত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের কোনো নির্বাচনী ফলাফলকেই কেউ বিশ্বাস করবে না।”
‘আরও বড় ধাক্কা: পছন্দের আমলা’
ভারতের ৬২ বছর বয়সী প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার প্রধানমন্ত্রী মোদির আস্থাভাজন সহযোগী এবং সরকারের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার কর্মজীবনের যোগসূত্র রয়েছে।
বর্তমানে তিনি ভোটার তালিকার বহুল বিতর্কিত সংশোধন প্রক্রিয়াটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
২০১৬ সালে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাশ্মীরবিষয়ক বিভাগে যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ওই বিভাগ ভারত-শাসিত কাশ্মীরের বিষয়গুলো দেখভাল করে।
তিন বছর পর জম্মু ও কাশ্মীরকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করার আইন প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় কুমারকে। ২০১৯ সালের আগস্টে মোদি সরকার বিতর্কিত অঞ্চলটির বিশেষ অধিকার বাতিল করার সময় সেখানে কয়েক মাসব্যাপী কারফিউ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা জারি করা হয়েছিল।
এর কয়েক মাসের মধ্যেই কুমারকে মোদি সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব দেওয়া হয়—বিতর্কিত রাম মন্দির নির্মাণ।
১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্র ডানপন্থী হিন্দু জনতা ১৬ শতকের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে। এর পর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং এতে ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম।
বহু বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ওই জায়গাটি হিন্দুদের দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সুপ্রিম কোর্টের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা দলের নেতৃত্ব দেন কুমার। এর মধ্যে নতুন মন্দির পরিচালনার জন্য একটি ট্রাস্ট গঠনও ছিল। ওই স্থানেই এখন মন্দিরটি নির্মিত হয়েছে।
নয়াদিল্লির থিংকট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের জ্যেষ্ঠ ফেলো নীলাঞ্জন সরকার বলেন, “ক্ষমতাসীন সরকারের এসব কাজ বাস্তবায়নের জন্য জ্ঞানেশ কুমার ছিলেন পছন্দের আমলা। তাকে যদি সরিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মোদি সরকারের জন্য এটি আরও বড় ধাক্কা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “কুমারকে হারানোর মূল্য আরও বেশি হবে। কারণ, এমন একজন ব্যক্তিকে যদি রক্ষা করতে না পারেন, তাহলে বৃহত্তর প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য সেটি আরও বড় বার্তা হবে।”
নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী বলেন, সরকারের নতি স্বীকারের প্রত্যাশা তিনি করছেন না। তার ভাষায়, “কুমারের পদত্যাগকে অপরাধ স্বীকারের মতো দেখা হবে। এতে নির্বাচনের বৈধতা এবং এর মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা দুর্বল হবে।”
ভারতের বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী কুমারকে কটাক্ষ করে তাকে রাজসাক্ষী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের’ অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
‘অভিজ্ঞ আন্দোলনকারীরা’
শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান থেকে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, এবার মোদি সরকার জন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ দিতে চায় না।
সিরকার বলেন, “আগের তরুণদের আন্দোলন থেকে সরকার কৌশলের দিক থেকে শিক্ষা নিয়েছে।” তার মতে, মোদি সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে চাইবে।
তিনি বলেন, “তারা আগেরবারের মতো কোনো দৃশ্য দেখতে চায় না। লক্ষ্য হবে শুরুতেই যেকোনো ধরনের জমায়েত ঠেকিয়ে দেওয়া।”
২০ জুলাই ‘ককরোচ’ আন্দোলন জন্তর মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। পরে হাজারো বিক্ষোভকারীকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে পার্লামেন্টের দিকে মিছিলের ডাক দেওয়া হয়। পুলিশ তাদের বাধা দেয় এবং সহিংসতার ঘটনায় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
এরপর রাজধানী দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী সতর্ক করে বলেছেন, এবার আন্দোলনের নেতারা আগের তুলনায় বেশি অভিজ্ঞ। ‘ককরোচ’ আন্দোলন থেকেই পরবর্তী সময়ে জেন জেড আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। ভারতের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণদের ‘ককরোচ’ হিসেবে তুলনা করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা একটি সাধারণ রসিকতা থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।
তখন কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো নেতারই বড় ধরনের গণআন্দোলন সংগঠনের অভিজ্ঞতা ছিল না। এখন তারা আবার রাস্তায় নেমেছেন “অভিজ্ঞ আন্দোলনকারী হিসেবে, যারা ইতোমধ্যে অনুসারী তৈরি করেছেন।”
আলী বলেন, “এখানে কোনো নিশ্চিত নিয়ন্ত্রণ নেই। আর এ কারণেই পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরণমুখী।”