ইট ভেঙে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে আমিনুল
নিউজ ডেস্ক
শৈশবেই মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন আমিনুল হক। মাত্র সাত মাস বয়সে মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। এরপর চাচা-চাচির কাছে বেড়ে ওঠা। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় হারান বাবাকেও। জীবনের এমন কঠিন সময়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে কখনো ইট ভেঙেছেন, কখনো কৃষিকাজ করেছেন, আবার কখনো টিউশনি করিয়েছেন।
নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে শেষ পর্যন্ত অর্জন করেছেন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। হয়েছেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সুপারিশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কান্দানিয়া গ্রামের আমিনুল হকের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম এবং মানুষের সহযোগিতা। পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি গ্রামের অনেক মানুষ তার পড়াশোনার খরচ জোগাতে পাশে দাঁড়িয়েছেন। সবার সহযোগিতা আর নিজের প্রচেষ্টায় তিনি পৌঁছেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর দীর্ঘ প্রস্তুতি শেষে বিসিএস ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।
৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পর ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও একই ক্যাডারে সুপারিশ পান আমিনুল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেটে তার নিয়োগ চূড়ান্ত হয়েছে। আগামী ১২ অক্টোবর তার চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
আমিনুলের এই অর্জন শুধু একটি চাকরি পাওয়ার গল্প নয়; বরং অভাবের সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্ন পূরণ এবং কঠিন সময়ে মানুষের সহযোগিতা কীভাবে একজনের জীবন বদলে দিতে পারে, তারও উদাহরণ।
শৈশব থেকেই সংগ্রামের শুরু
আমিনুলের বয়স যখন মাত্র সাত মাস, তখন তার মা আমিনা খাতুন ও বাবা ওয়াজউদ্দিন মিয়ার বিচ্ছেদ হয়। এরপর মায়ের সান্নিধ্য ছাড়াই বড় হতে থাকেন তিনি। কৃষিকাজ করে সংসার চালাতেন বাবা। কিন্তু ২০১২ সালে আমিনুল অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাও মারা যান।
এরপর চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুনের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠেন তিনি। নিজেদের সন্তানদের পাশাপাশি ভাতিজাকেও সমান স্নেহে বড় করেছেন তারা। দাদি ও ফুফুরাও বিভিন্ন সময়ে তার পাশে ছিলেন।
আমিনুল জানান, ছোটবেলাতেই মাকে হারানোর মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় তাকে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাও মারা যান। নিজের কোনো ভাইবোন না থাকায় চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরাই ছিলেন তার আপনজন।
পরিবারের এই কঠিন পরিস্থিতি তাকে অল্প বয়সেই বাস্তবতার মুখোমুখি করে। নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পড়াশোনাকেই প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নেন তিনি। তবে আর্থিক সংকটের কারণে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
পড়াশোনার খরচ চালাতে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম
ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ইট ভাঙার কাজ করেছেন আমিনুল। কখনো কৃষিকাজ করে অর্থ উপার্জন করেছেন। নবম শ্রেণিতে ওঠার পর শুরু করেন টিউশনি। এসব কাজের মাধ্যমে নিজের লেখাপড়ার খরচ মেটানোর চেষ্টা করতেন তিনি।
যে বয়সে অন্যরা খেলাধুলা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাত, সে বয়সে আমিনুলকে ভাবতে হতো কীভাবে পরের দিনের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করবেন। শৈশবের স্বাভাবিক আনন্দের অনেকটাই বিসর্জন দিতে হয়েছে তাকে।
আমিনুলের ভাষ্য, বন্ধুরা যখন মাঠে খেলতে যেত বা বেড়াতে বের হতো, তখন তাকে কাজ করতে হতো। সেই বয়সে বিষয়টি কষ্টের ছিল। অনেক সময় মনে হতো সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ নেই। তারপরও পড়াশোনাকেই নিজের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে আঁকড়ে ধরেছিলেন তিনি।
অর্থের অভাবে যেন পড়াশোনা বন্ধ না হয়ে যায়, সে জন্য নিজের উপার্জনের পাশাপাশি গ্রামের মানুষের সহায়তাও নিয়েছেন আমিনুল। কেউ দিয়েছেন অর্থ, কেউ কিনে দিয়েছেন খাতা-কলম, আবার কেউ পরীক্ষার ফি ও পোশাকের ব্যবস্থা করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ করিম জানান, স্কুলজীবন থেকেই তারা আমিনুলকে সহযোগিতা করতেন। প্রয়োজন অনুযায়ী খাতা, কলম ও পোশাক দেওয়ার পাশাপাশি কলেজে ভর্তি ও ফরম পূরণের সময়ও অর্থ দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভালো শিক্ষার্থী হওয়ায় তাকে সহযোগিতা করলে ভবিষ্যতে এলাকার মুখ উজ্জ্বল করবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের।
চাচা-চাচির স্নেহেই বেড়ে ওঠা
আমিনুলের জীবনে চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুনের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত অবস্থায় তারা তাকে নিজেদের সন্তানের মতো করে লালন-পালন করেছেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তার লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন।
চাচা আবদুল খালেকের ভাষ্য, আমিনুলের বয়স যখন সাত মাস, তখন তার মা চলে যান। এরপর অনেক কষ্ট করে তাকে বড় করেছেন। কখনো ভাতিজা হিসেবে আলাদা করে দেখেননি; নিজের সন্তানের মতোই আগলে রেখেছেন।
চাচি মিনারা খাতুনও আমিনুলকে নিজের সন্তানদের সঙ্গে সমানভাবে বড় করেছেন। তিনি জানান, আমিনুলের বাবা তাকে অনুরোধ করেছিলেন যেন নিজের তিন ছেলের পাশাপাশি আমিনুলকেও একই চোখে দেখেন। সেই কথা মেনে কখনোই তাকে আলাদা করে দেখেননি তিনি।
আমিনুলের জীবনে এই পারিবারিক ভালোবাসা ছিল বড় আশ্রয়। চাচা-চাচির ত্যাগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল দাদি-ফুফুদের স্নেহ এবং গ্রামবাসীর সহযোগিতা। এসবের পাশাপাশি নিজের পরিশ্রম ও অধ্যবসায় তাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিয়েছে।
কান্দানিয়া থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে
কান্দানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি পাস করেন আমিনুল। এরপর আছিম শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তার আবাসস্থল ছিল স্যার এ এফ রহমান হল।
গ্রামের সীমিত সুযোগ-সুবিধা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানো ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। তবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলেও আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। নিজের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও টিউশনি করিয়েছেন তিনি।
পরিবারের ত্যাগ, গ্রামবাসীর সহযোগিতা এবং বৃত্তিসহ বিভিন্ন সহায়তা তার শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পড়াশোনা শেষ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতিও নিতে থাকেন আমিনুল।
পাঁচ বিসিএসের প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণ
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরির প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেন আমিনুল। ২০২১ সালের মার্চ থেকে বিসিএসের জন্য নিবিড়ভাবে প্রস্তুতি শুরু করেন তিনি। প্রচলিত কোচিংয়ের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সহায়তায় পড়াশোনা চালিয়ে যান।
প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় পাঁচটি বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পাওয়ার পরও নিয়োগের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও একই ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।
সর্বশেষ গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে তার নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ায় দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। ইট ভাঙা ও কৃষিকাজ করে একসময় যে তরুণ নিজের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতেন, এখন তিনি শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সাফল্যের আনন্দেও রয়ে গেছে স্বজন হারানোর বেদনা
জীবনের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করলেও আমিনুলের মনে রয়েছে কিছু অপূর্ণতা। তার বেড়ে ওঠার পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের কয়েকজন এই সুখবর দেখে যেতে পারেননি।
আমিনুলের দাদি মোছা. ওমর জান ২০২১ সালে মারা যান। দাদি তাকে সব সময় বড় কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন এবং চাকরি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইতেন। কিন্তু নাতির ক্যাডার হওয়ার খবর শোনার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। বাবাও ছেলের এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি।
আমিনুল জানান, দাদি তাকে প্রায়ই বলতেন, একদিন তিনি বড় কর্মকর্তা হবেন। চাকরি কবে হবে, তা জানতে চাইতেন। তখন আমিনুল পড়াশোনা শেষ না হওয়ার কথা বলতেন। আজ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এলেও দাদি ও বাবাকে তা জানাতে না পারার কষ্ট তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
চাকরির খবর পাওয়ার পর বাবার ও দাদির কবর জিয়ারত করেন তিনি। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে তাদের ভালোবাসা ও উৎসাহ যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেই স্মৃতি এখনো তার মনে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
স্ত্রীর সমর্থনে নতুন জীবনের পথে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় আমিনুলের। পরে ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ সংগ্রামের সময়ে স্ত্রীর কাছ থেকে মানসিক সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
এখন চাকরিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন আমিনুল। তার কাছে সাফল্য কেবল একটি চাকরি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্য ধরে রাখা, পরিশ্রম চালিয়ে যাওয়া এবং সুযোগকে কাজে লাগানোই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণদের উদ্দেশে আমিনুলের পরামর্শ, জীবনে সফল হতে সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন। পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে হবে। তার বিশ্বাস, এই গুণগুলো ধারণ করতে পারলে চাকরি কিংবা ব্যবসা—যেকোনো ক্ষেত্রেই সফল হওয়ার পথ তৈরি করা সম্ভব।
আমিনুল হকের জীবনসংগ্রাম প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকলেও লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা থামিয়ে দেওয়া উচিত নয়। তবে এই যাত্রায় নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কান্দানিয়া গ্রামের এই তরুণের সাফল্য তাই শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়। এর সঙ্গে মিশে আছে চাচা-চাচির নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, গ্রামবাসীর আস্থা এবং বহু মানুষের ছোট ছোট সহযোগিতা। ইট ভেঙে পড়াশোনা চালানো থেকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার এই পথচলা হয়ে উঠেছে অধ্যবসায়, মানবিকতা ও স্বপ্ন পূরণের এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।