বারিধারায় ১২ কোটির ফ্ল্যাট, আয় মাত্র ৮০ লাখ এনবিআর কর্মকর্তার

প্রকাশ: ১২:১২, ১৩ মে ২০২৬

বারিধারায় ১২ কোটির ফ্ল্যাট, আয় মাত্র ৮০ লাখ এনবিআর কর্মকর্তার

সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ী তিনি ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তা। মাসে বেতন পান হাজার আশি টাকা। অথচ বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছেন রাজধানীর অভিজাত বারিধারা কূটনৈতিক জোনের ১২ কোটি টাকার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অতিরিক্ত কর কমিশনার শাহ মোহাম্মদ মারুফের এই রূপকথার মতো উত্থান এখন টক অব দ্য এনবিআর। কর গোয়েন্দাদের প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে তাঁর ৩০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের হদিস।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরিতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার মোট বৈধ আয় মাত্র ৮০ লাখ টাকা। কিন্তু তাঁর আয়কর নথিতেই সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৪ কোটি টাকার বেশি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ তথ্য:

  • বারিধারার প্রাসাদ: বারিধারায় স্ত্রীর নামে কেনা ১২ কোটি টাকার ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন তিনি। যার অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জাতেই ব্যয় হয়েছে কয়েক কোটি টাকা। প্রতি বর্গফুট ৪০ হাজার টাকা মূল্যের এই ফ্ল্যাটটি স্ত্রীর নামে কেনা হলেও আয়ের উৎস দেখাতে না পারায় এখনো নিবন্ধন করা সম্ভব হয়নি।

  • বেনামি সম্পদ: নিজের, স্ত্রীর এবং ভাই-বোনের নামে অন্তত ৩০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পেয়েছে কর গোয়েন্দারা।

  • ব্যাংক ব্যালেন্স: বেতনভোগী কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে কোটি কোটি টাকা।

মারুফের স্ত্রী সাদিয়া আফরিন একসময় একটি বেসরকারি আবাসন কোম্পানিতে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমানে কর্মহীন এই গৃহিণীর আয়কর নথিতে ১ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সম্পদ দেখানো হলেও ১২ কোটির ফ্ল্যাট কেনার কোনো বৈধ উৎস সেখানে নেই। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, নিজের অবৈধ উপার্জন বৈধ করতেই স্ত্রীর ফাইলকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন এই কর্মকর্তা।

এনবিআর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে গোপালগঞ্জের পরিচয় ব্যবহার করে মারুফ ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। কর অঞ্চল-৪, ৫, ১২ এবং নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও ‘লাভজনক’ স্থানে পোস্টিং নিয়ে তিনি করদাতাদের কর ফাঁকিতে সহায়তা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে সিরাজগঞ্জে বদলি হলেও তাঁর প্রভাব এখনো কমেনি বলে গুঞ্জন রয়েছে।

কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার আব্দুর রকিব জানিয়েছেন, তদন্ত চলছে এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। টিইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে ‘স্বার্থের সংঘাত’ ও ‘ভয়াবহ দুর্নীতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন:

"যেখানে সাধারণ মানুষ কর দিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়, সেখানে কর কর্মকর্তারাই কর ফাঁকিতে সহায়তা করে সম্পদ গড়ছেন—এটি চরম পরিহাস। শুধু বিভাগীয় শাস্তি নয়, দুদককেও এর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।"

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শাহ মোহাম্মদ মারুফ হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এমনকি বারিধারার বাসভবনে গিয়েও তাঁর দেখা পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন