চায়ের কাপে শ্রমিকের রক্ত-ঘাম

সোয়েব মোহাম্মাদ

প্রকাশ: ০০:৪৩, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০০:৫৮, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

চায়ের কাপে শ্রমিকের রক্ত-ঘাম

চায়ের কাপে শ্রমিকের রক্ত-ঘাম : প্রতিকি ছবি

 


গ্রাম-গঞ্জ থেকে শহর-বস্তি—সর্বত্রই চায়ের স্টলে নাগরিকের আনাগোনা। বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী কিংবা পরিজনদের সঙ্গে সকাল, বিকেল কিংবা সন্ধ্যার অবসরে চায়ের চুমুকে জমে ওঠে গল্পের আড্ডা।

মনে হয়, প্রতিদিনই যেন এক নামহীন উৎসবের সাথে আমাদের নতুন করে সাক্ষাৎ ঘটে। উষ্ণ চায়ের কাপে আলতো চুমুকে আমরা উপভোগ করি জীবনের ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত।

এক কাপ চায়ের দাম এলাকা ও পরিবেশভেদে ভিন্ন। ফুটপাতঘেঁষা চা-স্টলগুলোতে যেখানে ৫ থেকে ১০ টাকায় এক কাপ চা পাওয়া যায়, সেখানে ক্যাফে ও রেস্টুরেন্টে কাপ ও স্বাদের ভিন্নতায় লাল চায়ের দাম ১৫ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। যারা চায়ের প্রতি অভ্যস্ত, দিন শেষে অন্তত এক কাপ চা না পেলে তাদের মনে তৈরি হয় এক ধরনের অতৃপ্তি—থেকে যায় অজানা আক্ষেপ।

আমরা কি কখনো ভেবে দেখি চা আসে কোথা থেকে?

কখনো কি আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—এই চা কীভাবে উৎপাদিত হয়? আর যারা এই চা উৎপাদনের সাথে সরাসরি জড়িত, তাদের জীবনমান কেমন?

সাধারণত এসব প্রশ্ন আমাদের ভাবনায় আসে না। যেমন—বাজার থেকে মাছ কিনে এনে রান্না করে খাওয়ার পর আমরা খুব কমই ভাবি, কে বা কারা সেই মাছ চাষ করলো। চা শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক তেমনই হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কিন্তু আপনি যদি বিবেকের দরজা খুলে চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রার দিকে তাকান, তাহলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে গিয়ে মনে হবে—প্রতি চুমুকে যেন পান করছেন শ্রমিকের রক্ত ও ঘামে ভেজা অপরিশোধিত শ্রম। চোখে পড়বে শোষণের চরম প্রতিক্রিয়ায় বিধ্বস্ত এক সামাজিক জীবন।

১৭৮ টাকায় জীবনের হিসাব

বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা চা চাষের ওপর নির্ভরশীল। একজন চা শ্রমিককে দৈনিক ২৩ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। সামান্য হেরফের হলেই কাটা পড়ে মজুরি।
চা গাছ ছাঁটাইয়ের সময় দিনে অন্তত ২৫০টি গাছ ছাঁটাই, আর কীটনাশক ছিটানোর ক্ষেত্রে এক একর জমিতে কাজ শেষ করতে হয়।

এত কিছুর পর দিনশেষে একজন শ্রমিকের হাতে আসে মাত্র ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা।

বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে এই আয়ের তুলনা করলে বৈষম্যটি পানির মতো স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। আজকাল বাজারে গেলে ৫০০ টাকায় ব্যাগ পুরোপুরি ভরে না। সেখানে চার সদস্যের পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে একজন শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৫০০ টাকা বা তার বেশি আয় করেও হিমশিম খান, সেখানে ১৭৮ টাকায় চা শ্রমিকদের জীবনমান কতটা মানবেতর—তা অনুমান করতে কষ্ট হয় না।

উপনিবেশ শেষ, শোষণ শেষ নয়

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান শাসনের অবসান ঘটলেও চা শ্রমিকদের জীবনে দারিদ্র্যের অবসান ঘটেনি। অনেক শ্রমিকের তিন বেলা খাবার জোটে না। প্রতিদিন অন্তত একবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। অসুস্থতার কারণে একদিন কাজে যেতে না পারলে পুরো দিন কাটে উপোসে।

ক্ষুধার তাড়নায় ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই তাদের কাজে যেতে হয়।

শিশুশ্রমের নিষ্ঠুর চক্র

আর্থিক সংকটে চা শ্রমিকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে পারেন না। অভাবের তাড়নায় শিশুরা বঞ্চিত হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে এবং খুব অল্প বয়সেই যুক্ত হয় শ্রমে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ।

আন্দোলন ছাড়া মজুরি বাড়ে না

প্রায় প্রতিবছরই শোনা যায়—চা বাগান মালিকরা শ্রমিকদের কয়েক মাসের বেতন বকেয়া রেখেছেন। বকেয়া ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে শ্রমিকদের বারবার আন্দোলনে নামতে হয়েছে। ইতিহাস বলে—আন্দোলন ছাড়া তাদের মজুরি কখনো বাড়েনি।

চা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির চিত্র আরও হতাশাজনক—

২০০৮: দৈনিক ৩২ টাকা

২০০৯: বেড়ে ৪৮ টাকা

২০১৭: বেড়ে ১০২ টাকা

২০২০: বেড়ে ১২০ টাকা

২০২২: তিন সপ্তাহের আন্দোলনের পর ১৭০ টাকা

২০২৪: মাত্র ৮ টাকা ৫০ পয়সা বাড়িয়ে ১৭৮ টাকা ৫০ পয়সা

বৈদেশিক আয় বাড়ে, শ্রমিকের ভাগ বাড়ে না

চা উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম অবস্থানে। ২০২৪ সালে চা রপ্তানি করে বৈদেশিক আয় হয়েছে প্রায় ৪৫৯.৬ কোটি টাকা। অথচ এই আয়ের সুফল শ্রমিকদের জীবনে প্রতিফলিত হয়নি।

তুলনামূলকভাবে—

ভারতে চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি প্রায় ৩৩০ টাকা

শ্রীলঙ্কায় প্রায় ৫০০ টাকা

চীনে ন্যূনতম ১,০০০ টাকা

অথচ বাংলাদেশের চা শ্রমিক আজও আটকে আছে ১৭৮ টাকায়।

লাভের হিসাব, মানুষের হিসাব নেই

একটি চা গাছ ৫০ বছরের বেশি সময় বাঁচে। বছরে নতুন করে চারা রোপণের বড় কোনো খরচ নেই। বাগান মালিকরা এক কেজি চা পাতা বিক্রি করে পান ১৮০–২৪৫ টাকা, আর খুচরা বাজারে সেই চা বিক্রি হয় ৪২০–৭৫০ টাকা কেজি দরে।

অথচ ২৩ কেজি পাতা সংগ্রহ করে একজন শ্রমিক পান মাত্র ১৭৮ টাকা।

প্রশ্ন থেকেই যায়…

অপুষ্টি, অশিক্ষা, জরাজীর্ণ বাসস্থান—চা শ্রমিকদের জীবন যেন অবহেলার এক দীর্ঘ দলিল। মিডিয়ায় বহুবার এই বেহাল দশার খবর প্রকাশিত হলেও বাস্তব পরিবর্তন খুবই সামান্য। রাষ্ট্রের শ্রম মন্ত্রণালয়ও যেন নীরব দর্শকের ভূমিকায়।

তাই প্রশ্ন থেকেই যায়—
কবে চা শ্রমিকরা এই শোষণ থেকে মুক্তি পাবে?
কবে তারা তিন বেলা পেট ভরে ভাত খেতে পারবে?
কবে তাদের শিশুরা অপুষ্টির বদলে পাবে সুস্বাস্থ্য ও শিক্ষা?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অজানা।

তরুণ লেখক ও কবি: সোয়েব মোহাম্মাদ
 

আরও পড়ুন