নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২:০০, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
জিল্লুর রহমান (প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ)- ছবি: কালের কন্ঠ
নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারবার একটি বিষয় সামনে আসে—এটি আর কেবল একটি নিয়মিত ভোটের আয়োজন নয়। চারদিকে বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি ও পরিসংখ্যানের আধিক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের অনুভূতির জায়গাটি ক্রমেই ফাঁকা হয়ে উঠছে। ভোটকে ঘিরে মানুষের মনে একসঙ্গে আশা, ক্লান্তি ও সংশয় কাজ করছে। কেউ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে, আবার অনেকেই মনে করছে—ভোট দিলেও জীবনে বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসে না।
এই মানসিক দ্বন্দ্বই বর্তমান নির্বাচনি বাস্তবতার সবচেয়ে বড় চিত্র। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচন যেন মানুষের অংশগ্রহণের উৎসব না হয়ে ধীরে ধীরে একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে। দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় মানুষ এখন শুনছে, ভাবছে, কিন্তু প্রকাশ করছে না। এই নীরবতা উদাসীনতা নয়—এটি জমে থাকা প্রশ্নের বহিঃপ্রকাশ।
মানুষ জানতে চায়—তার ভোট কি সত্যিই উন্নতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? যদি ভোটের প্রতি আস্থা কমে যায় বা ভুল তথ্যে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, তাহলে নির্বাচনের ফল কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। কিছু রাজনৈতিক দল ভোটকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন তা ধর্মীয় কর্তব্য। ভোট না দিলে বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এমন বার্তা দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়; এটি মানুষের বিশ্বাসের জায়গায় সরাসরি আঘাত। গ্রাম ও শহরের বিভিন্ন নির্বাচনি সভায় ধর্মকে ভোটের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে, যা বিভ্রান্তি ও ভয় তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে সমাজে বিভাজন বাড়ে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ দুর্বল হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান একে অনৈতিক ও ধর্মের প্রতি অসম্মানজনক বলে মন্তব্য করেছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, ভোটের সঙ্গে জান্নাত বা জাহান্নামের ধারণা যুক্ত করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
নির্বাচনি আচরণবিধিতে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও এর বাস্তব প্রয়োগ প্রশ্নের মুখে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
বাংলাদেশের নির্বাচন আলাদা কোনো দ্বীপে হচ্ছে না। বৈশ্বিক রাজনীতি আজ সংঘাত, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তায় ভরা। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন যুদ্ধ, অস্ত্র প্রতিযোগিতা ও ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ ছোট দেশগুলোর ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে নেতারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার সংকট নিয়ে আলোচনা করছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
সোশ্যাল মিডিয়া আজ রাজনীতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। এটি যেমন দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেয়, তেমনি ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক বিষয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই মাধ্যম মানুষকে সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক বানাতে পারে, আবার বিভক্তও করতে পারে। দায়িত্বহীন ব্যবহার সামাজিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই তথ্য যাচাই, সংযম ও নৈতিক আচরণ এখানে অত্যন্ত জরুরি।
নির্বাচন, ধর্মীয় রাজনীতি, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও সোশ্যাল মিডিয়া—এই চারটি বিষয় আলাদা মনে হলেও বাস্তবে একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এগুলো একসঙ্গে নাগরিকের মনোজগৎ, আস্থা ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের সংখ্যা নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, স্বাধীন চিন্তা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের সমষ্টি। যদি মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক দায়িত্ব ও সচেতনতা না থাকে, তাহলে নির্বাচন কেবল একটি পরিসংখ্যান হয়ে থাকবে—মানুষের গল্প হয়ে উঠবে না।
লেখক : জিল্লুর রহমান
প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ
সূত্র: কালের কন্ঠ
ব্রেকিং