প্রকাশ: ১২:০৩, ১১ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৫, ১১ জুন ২০২৬
রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তি লেনদেন এলাকার একটি—গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির দলিল নিবন্ধন হয়। সেই গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়কে ঘিরেই এখন উঠছে নানা অভিযোগ।
সরকারি দায়িত্বে থাকা এই কার্যালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। জমির শ্রেণী পরিবর্তন, কম মূল্য দেখিয়ে নিবন্ধন, দলিল যাচাইয়ে দুর্বলতা, কথিত ঘুষ লেনদেন এবং দালালনির্ভর সেবা ব্যবস্থার অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গুলশান সাব-রেজিস্ট্রার মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন। অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি চাকরির দায়িত্ব পালনের সময়ই এসব অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন এর আগে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময়ও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠেছিল বলে দাবি করছেন অভিযোগকারীরা।
গুলশান, বাড্ডা ও আশপাশের এলাকায় জমির মূল্য দেশের অন্যতম বেশি। ফলে এসব এলাকার একটি দলিলের সামান্য শ্রেণীগত পরিবর্তনও সরকারি রাজস্বে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে উন্নত বা বসতভিটা জমিকে কম মূল্যের শ্রেণীতে দেখিয়ে নিবন্ধন ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
অভিযোগকারীরা একটি সাব-কবলা দলিলের উদাহরণ দিয়ে দাবি করেছেন, ৩ মে ২০২৬ তারিখের ৩৪৫৯ নম্বর দলিলে প্রায় ১০.৬৬ কাঠা জমিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাদের দাবি, জমিটির প্রকৃত মূল্য ও শ্রেণীর সঙ্গে দলিলের তথ্যের পার্থক্য থাকলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে জমির খতিয়ান, নামজারি, রেকর্ড অব রাইটস এবং সরকারি মূল্যায়ন নথি যাচাই করাই মূল বিষয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে দলিলের তথ্য যাচাই, মালিকানা ইতিহাস পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রশ্ন রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, যদি যাচাই প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা থাকে, তাহলে জাল কাগজপত্র বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভূমি বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি দলিল শুধু নিবন্ধন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং দলিলের তথ্য সঠিক কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো কথিত অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি ফি ছাড়াও বিভিন্ন ধাপে অতিরিক্ত অর্থের চাপ তৈরি হয়। কেউ কেউ দাবি করেছেন, অর্থ না দিলে কাজ বিলম্বিত হওয়ার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
দেশের বিভিন্ন নিবন্ধন অফিস নিয়ে অতীতে এমন অভিযোগ উঠেছে। কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমন সংস্থার অভিযানও হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অফিস ঘিরে সক্রিয় রয়েছে একটি দালাল নেটওয়ার্ক।
সাধারণ মানুষ যেখানে নিয়ম-কানুন বুঝতে সমস্যায় পড়েন, সেখানে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন—সরকারি সেবা নিতে কেন সাধারণ মানুষকে তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর করতে হবে?
অভিযোগে নকলনবিশ মো. গিয়াস উদ্দিনের নামও এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রমে তার প্রভাব রয়েছে এবং কিছু বিতর্কিত দলিল সম্পাদনে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত বা আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের আয়, জীবনযাপন, সম্পদের বৃদ্ধি এবং দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—সেটিও প্রয়োজন হলে যাচাই করা উচিত।
তাদের প্রশ্ন, সরকারি চাকরির মাধ্যমে অর্জিত আয়ের সঙ্গে যদি সম্পদের অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নজরদারি জরুরি।
অভিযোগকারী আবু হানিফ দাবি করেছেন, তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
তার দাবি, দলিল, রাজস্ব হিসাব, অফিস রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে ওঠা অভিযোগ শুধু একটি অফিসের বিষয় নয়; এটি ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জনআস্থার প্রশ্ন।
ব্রেকিং