নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:১৬, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসন নীতিতে স্থবির গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়া, ধাক্কায় বাংলাদেশিসহ ৭৫ দেশের পরিবার
যুক্তরাষ্ট্রে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নীতিতে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ১৪ জানুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এক ঘোষণায় জানায়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে ২১ জানুয়ারি থেকে।
স্থগিতাদেশের আওতায় রয়েছে গ্রিন কার্ড, ফ্যামিলি রিইউনিয়ন এবং এমপ্লয়মেন্ট-ভিত্তিক স্থায়ী ভিসা। ফলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের স্বপ্ন দেখা অসংখ্য পরিবার হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ দেশের অভিবাসন প্রত্যাশীদের সরাসরি প্রভাবিত করবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ সিদ্ধান্তকে সাময়িক বলা হলেও সহজে প্রত্যাহারের সম্ভাবনা কম। নতুন নীতির ফলে কেবল ‘অত্যন্ত যোগ্য’ অভিবাসীদের জন্য সীমিত সুযোগ থাকতে পারে। মার্কিন আইনজীবীদের ধারণা, ভবিষ্যতে মূল্যায়নের মাধ্যমে কিছু পরিবর্তন এলেও বাংলাদেশিসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে স্থায়ী বসবাসের পথ আরও সংকুচিত হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো—যেসব দেশের অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তা (ওয়েলফেয়ার, মেডিকেড, ফুড স্ট্যাম্পস ইত্যাদি) গ্রহণের ঝুঁকিতে থাকেন, তাদের ভিসা দেওয়া হবে না। প্রশাসনের দাবি, এসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভিসার মেয়াদ শেষের পর অবস্থান (ওভারস্টে), জালিয়াতি এবং পাবলিক বেনিফিট ব্যবহারের হার তুলনামূলক বেশি।
তবে তালিকায় থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস ও ব্রাজিলের মতো দেশ যুক্ত হওয়ায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দেশের অভিবাসীরা সাধারণত স্বনির্ভর এবং পাবলিক চার্জ হওয়ার ঝুঁকি কম। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সিকিউরিটি ফার্স্ট’ নীতির কারণে তারাও কঠোর নজরদারির আওতায় এসেছে। উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ডের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে—সেখানকার অভিবাসীরা উচ্চশিক্ষিত হলেও প্রশাসনের মতে ওভারস্টে ও জালিয়াতির ঝুঁকি রয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে পাবলিক চার্জ রুলের আরও বিস্তৃত প্রয়োগ। যদিও ১৮৮২ সালের ইমিগ্রেশন আইনে এ ধারণার অস্তিত্ব ছিল, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এর পরিধি বাড়ান। সে সময় বয়স, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ইংরেজি দক্ষতা, আর্থিক সামর্থ্য ও পারিবারিক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারণ করা হতো কেউ ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হবে কি না। বাইডেন প্রশাসন পরে এ কঠোরতা শিথিল করলেও ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে এসে নিয়মটি আরও কঠিন করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কিছু অভিবাসীর ভুল তথ্য দিয়ে জনকল্যাণমূলক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতাও এই কঠোর সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থকদের দাবি, এতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় কমবে এবং এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক।
এক অভিবাসন আইনজীবী মুখপত্রকে বলেন, “এই স্থগিতাদেশ কেবল আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়, এটি মানসিক ও পারিবারিক বিপর্যয়ও। বহু মানুষের সাজানো জীবন পরিকল্পনা এক মুহূর্তে ভেঙে পড়েছে—যার মূল্য টাকায় মাপা যায় না।”
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তকে ভিন্নভাবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি মুখপত্রকে বলেন, “এটি এক ধরনের ‘ব্লেসিং ইন ডিসগাইজ’। এই নিষেধাজ্ঞা ব্রেন ড্রেইন কমাতে সহায়ক হতে পারে। আমাদের মেধাবীরা বিদেশে চলে যাচ্ছেন, এতে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন তাদের দেশেই কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। অভিবাসনের ওপর নির্ভর না করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার দিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত।”
ব্রেকিং