শত কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশ: ১২:৩৯, ২৬ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১২:৫৭, ২৭ জুলাই ২০২৬

শত কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজিং বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. ছাইদুর রহমানকে ঘিরে শত কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পে অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রভাব খাটানোর একাধিক অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করলেও দীর্ঘ সময় পার হলেও তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

বিআইডব্লিউটিএ ও দুদকের একাধিক সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনার কংস ও ভোগাই নদীর মোহনগঞ্জ থেকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পর্যন্ত প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার নৌপথ খননের কাজ বাস্তবায়ন করা হয় 'অভ্যন্তরীণ নৌপথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (প্রথম পর্যায়ে ২৪টি নৌপথ)' প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পে প্রায় ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও অভিযোগ রয়েছে, কাজ শেষ হওয়ার পরও নদীর কাঙ্ক্ষিত নাব্য ফিরে আসেনি।

দুদক সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, ড্রেজিং শেষে শুষ্ক মৌসুমেও নির্ধারিত গভীরতায় নৌযান চলাচলের উপযোগী পানি থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি ড্রেজার, এক্সকাভেটর ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খননকাজ সম্পন্ন করার কথা উল্লেখ ছিল। তবে অনুসন্ধানকালে এসব কাজ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

অনুসন্ধান-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পের প্রাক্কলনে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ড্রেজিং দেখানো হয়েছিল। দরপত্রে এক্সকাভেটরের মাধ্যমে খননের যে পরিকল্পনা ছিল, বাস্তবে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রমাণ মেলেনি। বর্ষা শেষে নদীর বিভিন্ন স্থানে আবারও পলি জমতে দেখা যাওয়ায় প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায় ১৩৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। এ বিষয়ে দুদক প্রকল্পসংক্রান্ত নথি সংগ্রহের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। অনুসন্ধানে খননকাজের প্রকৃত পরিমাণ, অপসারিত মাটির হিসাব এবং বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া যাচাই করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও অনুসন্ধান শেষ হয়নি।

প্রকল্প ঘিরে আরও অভিযোগ রয়েছে, নদী খননের আড়ালে স্থানীয়ভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, কার্যাদেশ পাওয়ার পর কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিকল্পনার বাইরে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের পুরো বিল উত্তোলন করা হলেও নদীর কাঙ্ক্ষিত গভীরতা নিশ্চিত করা হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের অর্থের একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা, প্রকৌশলী এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো বিচারিক সিদ্ধান্ত হয়নি।

দুদক সূত্র জানায়, ভোগাই ও কংস নদী খনন প্রকল্পে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন নথি ও তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক, বিআইডব্লিউটিএর মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী এবং দুই নির্বাহী প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যদিও অভিযোগকারীদের দাবি, মামলা করার মতো তথ্য-প্রমাণ রয়েছে, তবুও এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের হয়নি।

ছাইদুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়েও পৃথক অনুসন্ধান করছে দুদক। অনুসন্ধানের আওতায় তার স্ত্রী শামিমা আক্তার এবং বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়ার সম্পদের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২০২০ সালে সংশ্লিষ্টদের সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়। পরে তারা সম্পদের বিবরণী জমা দেন এবং জিজ্ঞাসাবাদেও অংশ নেন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই অনুসন্ধানেরও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, ছাইদুর রহমানের আয়কর নথিতে উল্লেখ করা স্বর্ণ বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত আয়ের তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, যে প্রতিষ্ঠানের রসিদ দেখানো হয়েছে, বাস্তবে সেই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট এবং কুড়িগ্রামে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দুদক এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।

ছাইদুর রহমানের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

এদিকে বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, তাকে ড্রেজিং বিভাগ থেকে বদলি করে ঢাকা অফিসের প্রকৌশল বিভাগে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পুর) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ; তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, কাজের পরিমাপ কীভাবে করা হয়েছে, সেই পরিমাপের ভিত্তিতে কারা বিল অনুমোদন করেছেন এবং প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—এসব বিষয়ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, জনগণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. ছাইদুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।

 

আরও পড়ুন