ভারতীয় রুপিতে বাংলাদেশে বাণিজ্য করতে চায় রাশিয়া

প্রকাশ: ১১:৩৪, ২৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪১, ২৯ জুলাই ২০২৬

ভারতীয় রুপিতে বাংলাদেশে বাণিজ্য করতে চায় রাশিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার চক্রব্যুহে আটকে থাকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্থ পরিশোধ সহজ করতে বাংলাদেশকে চমকপ্রদ কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। ডলার এড়িয়ে ভারতীয় রুপিতে রূপপুর প্রকল্পের ঋণ ও বাণিজ্য নিষ্পত্তি, ঢাকায় একটি স্বতন্ত্র পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং রুশ ব্যাংকের শাখা খোলার প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো।

আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-রাশিয়া ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল কমিশন অন ট্রেড, ইকোনমিক, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কোঅপারেশন’-এর মেগা বৈঠকে এসব স্পর্শকাতর ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্ববহ প্রস্তাব নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হতে যাচ্ছে। এ বৈঠকের আগেই নিজেদের অবস্থান ও এজেন্ডা চূড়ান্ত করতে আজ জরুরি প্রস্তুতিমূলক বৈঠকে বসছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তির অর্থ পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে বর্তমানে সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার একটি বিশেষ অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়া হলেও, নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই অর্থ মস্কো নিয়ে যেতে পারছে না।

এর আগে চীনা মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ লেনদেনের চেষ্টা করা হলেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে চীন ও বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো তা পিছিয়ে দেয়। সোনালী ব্যাংকে জমে থাকা অর্থ বাংলাদেশেই বিনিয়োগের প্রস্তাব ঢাকা দিলেও মস্কো তা নাকচ করে দেয়।

এমন জটিল পরিস্থিতিতে রুপিকে হাতিয়ার করতে চায় রাশিয়া। যদিও ভারত-রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি 'কারেন্সি সোয়াপ' বা মুদ্রা বিনিময় চুক্তি নেই, তবুও তারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে রুপি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও ইতোমধ্যে ভারতের সঙ্গে রুপিতে বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু করায় এই পদ্ধতি প্রয়োগকেই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মনে করছে রাশিয়া। পাশাপাশি ঢাকায় ব্যাংক খোলা এবং নিজস্ব পেমেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরির পুরোনো দাবিও তারা নতুন করে সামনে আনলো। (উল্লেখ্য, এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ব্যাংক খোলার প্রস্তাব এসেছিল, যা বাংলাদেশ ব্যাংক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ভেটিংয়ের জন্য পাঠালে আর এগোয়নি)।

নিষেধাজ্ঞার ধাক্কায় দুই দেশের বাণিজ্য কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে রাশিয়ায় বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেলেও চলতি অর্থ বছরে (জুলাই-মে) তা নেমে এসেছে মাত্র ২৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। এ অবস্থা কাটাতে মস্কো বড় ধরণের বাণিজ্যিক ছাড় ও প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে: জি-টু-জি (G2G) পদ্ধতিতে বিসিআইসি-কে ২ লাখ ৮০ হাজার টন ইউরিয়া সার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া, যা আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে টনে ১০ ডলার কম। নিয়মিত গম ও এমওপি (MOP) সারের পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, হলুদ মটরশুঁটি, ছোলা এবং লাল ও সবুজ মসুর ডাল সরবরাহ করতে চায় তারা। সম্প্রতি সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে রাশিয়া প্রতিনিধিদলের বৈঠকে এসব বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। আমদানিকারকদের জন্য বিশ্বস্ত বাংলাদেশি বস্ত্র সরবরাহকারীদের একটি সনদপ্রাপ্ত তালিকা এবং 'রাশিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল' গঠনের তাগিদ দিয়েছে মস্কো। বাংলাদেশে রাশিয়ার সহায়তায় ডেডিকেটেড বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পাশাপাশি দুই দেশের এসএমই (SME) খাতের মেলবন্ধন ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

রাশিয়ার আর্থিক কাঠামোর নানা প্রস্তাবের ভিড়ে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার একদম স্পষ্ট। আসন্ন যৌথ কমিশন বৈঠকে ঢাকার মূল লক্ষ্য থাকবে রাশিয়ার থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) নিশ্চিত করা।

এর বাইরে বাংলাদেশ যেসব খাতে রাশিয়ার বড় বিনিয়োগ ও সহায়তা চাইছে: বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সামগ্রিক জ্বালানি খাতের কাঠামোগত উন্নয়ন, ই-কমার্স, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং উদ্ভাবন খাত, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে যৌথ উদ্যোগ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং লজিস্টিকস খাত।

এক নজরে যৌথ কমিশন

২০১৭ সালে গঠিত এই কমিশনটি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্রধান চালিকাশক্তি। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১৫ মার্চ ভার্চ্যুয়ালি এই কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তার আগে ২০১৮ (মস্কো), ২০১৯ (ঢাকা) এবং ২০২১ সালেও কমিশন বৈঠক হয়। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের আসন্ন বৈঠকটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পেক্ষাপটে বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন মোড় উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

আরও পড়ুন