প্রকাশ: ১২:৫৭, ২৭ জুলাই ২০২৬
নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা নেই, নেই আইনের ভয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের জাদুকরী এক নাম—তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ারুল আজিম। যাকে বলা চলে গণপূর্তের ‘অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতির পাগলা ঘোড়া’। চাকরিতে যেখানেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই তৈরি হয়েছে অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও লুটপাটের নতুন রেকর্ড। ঘুষ ও জালিয়াতির ওপর ভর করে গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার টাকার সাম্রাজ্য। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখোমুখি হয়েছেন দু-দুবার, ফেস করেছেন একাধিক বিভাগীয় তদন্ত—তবুও তাকে থামায় কে? বহাল তবিয়তে চালিয়ে যাচ্ছেন দুর্নীতির মহোৎসব।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সরকারি অর্থ লুটপাট করে অবৈধ আয়ের বড় একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন আজিম। কানাডায় তৈরি করেছেন আলিশান বাড়ি। শুধু বিদেশেই নয়, দেশেও গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর রোডের ৮৯/বি নম্বর প্লটে রয়েছে তার চোখধাঁধানো আলিশান বাড়ি। মিরপুর রূপনগরের সি-ব্লকের ১১ নম্বর রোডে রয়েছে ৬ কাঠার দুটি মূল্যবান প্লট (৩২/এ ও ৩৩/এ)। এছাড়া টোলারবাগে পানির ট্যাঙ্কের কাছেই রয়েছে একটি ৬ তলা ভবন এবং শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। দক্ষিণখান এলাকায় রয়েছে নিজস্ব গার্মেন্টস কারখানা।
নিজের চলাচলের জন্য ব্যবহার করেন ব্র্যান্ড নিউ 'হ্যারিয়ার লেক্সাস' গাড়ি। সুশীলতার আড়ালে তার রঙিন জীবনযাত্রাও বেশ চর্চিত—কথিত মডেল ও কলগার্লদের নিয়ে কারণে-অকারণে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে প্রমোদ ভ্রমণের ভুরি ভুরি অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের পদ-পদবি ব্যবহার করে স্বজনপ্রীতির চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এই প্রকৌশলী। নিজের ভাই ও শালাকে সামনে রেখে মূলত তিনিই পরোক্ষভাবে চালিয়ে আসছেন ঠিকাদারি ব্যবসা। বিশ্বস্ত নিকটাত্মীয় রেজাউলকে দিয়ে ‘ইউনিভার্সাল এন্টারপ্রাইজ’সহ বেশ কয়েকটি ভুয়া ও বেনামী প্রতিষ্ঠানের নামে গণপূর্তের বড় বড় কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন। লাইসেন্স অন্যের হলেও কাজ ও কমিশন চলে যায় আজিমের পকেটে।
লীগ সরকারের আমলে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ঢাকার মহাখালী সাবডিভিশনের এসডিইসহ গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রেখেছিলেন নিজের অবস্থান। ২০১৫ সালে গাজীপুর ডিভিশনে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। তখন ই-জিপি টেন্ডার না থাকার সুযোগে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের টেন্ডার ম্যানুয়ালি করে ঊর্ধ্বতনদের দোহাই দিয়ে বাগিয়ে নেন কোটি কোটি টাকার পার্সেন্টেজ। গণমাধ্যমের চাপে সিরাজগঞ্জে বদলি হলেও সেখানে নির্মাণাধীন মেডিকেল কলেজের কাজ থেকে কোটি টাকা লোপাট করে ২০১৯ সালে আবার ফিরে আসেন গাজীপুরে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে গাজীপুর গণপূর্তের ৩৪টি কাজের কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শুধু হস্ত-রশিদের মাধ্যমে ৪৯ কোটি ২৯ লাখ ২২ হাজার ৩০৬ টাকা ভুয়া বিল পাস করিয়ে দেন ঠিকাদারদের, যা পরে তার পকেটে কমিশন হিসেবে ঢোকে। প্রমোশন পেয়ে পাবনা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পে চরম অনিয়ম শুরু করেন। স্থানীয় ঠিকাদাররা তার বেপরোয়া ঘুষ বাণিজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে তাকে সরাসরি লাঞ্ছিত পর্যন্ত করেন। এরপর সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেনশন) হলেও টাকার জোরে তা কাটিয়ে ফের চাঙ্গা হয়ে ওঠেন।
পাবনার কেলেঙ্কারির পর আড়াল হতে নতুন মিশন নিয়ে পোস্টিং নেন রাঙামাটি গণপূর্ত সার্কলে। সেখানেও রাঙামাটি মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পকে টার্গেট করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঢাকা থেকে আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের ডেকে এনে বড় কাজ পাইয়ে দিয়ে পাহাড়ে বসেও তিনি মূলত পতিত ফ্যাসিবাদকে পুনর্বাসনের কুৎসিত খেলায় মেতেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গাজীপুর গণপূর্তের কয়েকজন স্টাফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আজিম স্যারের মতো অসাধু কর্মকর্তাদের শতকোটি টাকার দুর্নীতির কারণেই আজ পুরো গণপূর্ত বিভাগ বিতর্কিত। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অর্থ সহায়তার মতো গুরুতর অভিযোগও তাদের অপকর্মের ফলেই আমাদের ডিপার্টমেন্টের ওপর এসে পড়েছে।”
একজন প্রকৌশলীর চাকুরির আড়ালে এমন থ্রিলার কিংবা উপন্যাসের গল্পকেও হার মানানো লুটপাটের কাহিনি নিয়ে অনুসন্ধানী সংবাদের দ্বিতীয় পর্বে থাকছে—কীভাবে ভুয়া মাস্টাররোলে কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করেছিলেন আজিম! চোখ রাখুন আগামী পর্বে...
ব্রেকিং