গাজায় ডব্লিউসিকে হামলা তদন্তে কানাডা-যুক্তরাজ্য-অস্ট্রেলিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩:১৯, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

গাজায় ডব্লিউসিকে হামলা তদন্তে কানাডা-যুক্তরাজ্য-অস্ট্রেলিয়া

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ত্রাণ সংস্থা ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের একটি গাড়ির ধ-ছবি: আল জাজিরা

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ২০২৪ সালে ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেন (ডব্লিউসিকে)-এর সাতজন মানবিক সহায়তাকর্মীর প্রাণহানির ঘটনায় ড্রোন হামলার তদন্ত শেষ করেছে। রায় কী? কোনো ফৌজদারি তদন্তের প্রয়োজন নেই। তবে এর পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

হামলার ঘটনায় ফৌজদারি দায় নির্ধারণে তদন্ত না চালানোর সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে পশ্চিমা দেশগুলো। তারা একে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনান্দ এটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেছেন। অস্ট্রেলিয়া সরকার জানিয়েছে, তারা এতে ‘ক্ষুব্ধ’। পোল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা এ ঘটনায় ‘হতাশ’।

পশ্চিমা দেশগুলো যদি সত্যিই ইসরায়েলি তদন্তের ফলাফলে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে তাদের নিজেদেরই অপরাধটির তদন্ত করা উচিত। এ ধরনের তদন্তের জন্য তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও আইনি অধিকার রয়েছে। তদন্ত না চালানোর অর্থ হবে, গাজায় তাদের দেশের নাগরিকসহ ত্রাণকর্মীদের হত্যার ঘটনায় ইসরায়েলকে দায়মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি তারা মেনে নিচ্ছে।

ডব্লিউসিকে বহরের ওপর ড্রোন হামলার পর তোলা ছবিতে দেখা যায়, সংস্থাটির গাড়িগুলোর ছাদ ভেদ করে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং সেখানে একটি পোড়া গর্ত তৈরি হয়েছে—যার ঠিক পাশেই ছিল সংস্থাটির লোগো। ডব্লিউসিকে বহরের তিনটি গাড়িই স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ছিল এবং গাজা উপত্যকাজুড়ে তাদের চলাচল ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় করা হয়েছিল।

এত সতর্কতাও লালজাওমি ফ্র্যাঙ্ককম (অস্ট্রেলিয়া, ৪৩), ড্যামিয়ান সোবল (পোল্যান্ড, ৩৫), সাইফেদ্দিন ইসাম আয়াদ আবুতাহা (ফিলিস্তিন, ২৫), জ্যাকব ফ্লিকিঙ্গার (যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দ্বৈত নাগরিক, ৩৩), এবং ব্রিটিশ নাগরিক জন চ্যাপম্যান (৫৭), জেমস হেন্ডারসন (৩৩) ও জেমস কিরবি (৪৭)-এর জীবন রক্ষা করতে পারেনি। ২০২৩ সাল থেকে গাজায় নিহত এক হাজারের বেশি মানবিক সহায়তাকর্মীর মধ্যে তারাও রয়েছেন।

ডব্লিউসিকে বহরের ওপর হামলায় সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কানাডার আনান্দও এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি সশস্ত্র সংঘাতের আইন প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘কানাডা আশা করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা হবে।’

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী হামলাটি ভুলবশত হলেও এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কোনো হামলাকে ‘দুঃখজনক ভুল’ বলা দায়ীদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো জাদুর কাঠি নয়। হামলায় জড়িতরা যদি বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি স্পষ্ট অবহেলা দেখিয়ে বেপরোয়াভাবে কাজ করে থাকেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তারা যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ী হতে পারেন।

ডব্লিউসিকে বহরের ওপর হামলার নির্দেশদাতা কমান্ডার কর্নেল নোচি মেন্ডেল এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি যা করেছি, তার জন্য আমি দুঃখিত নই।’

বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির জন্য একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার কোনো অনুশোচনা না দেখানো এমন পরিস্থিতিতে খুব একটা বিস্ময়কর নয়। দায়মুক্তির সংস্কৃতি এমন পরিবেশেই গড়ে ওঠে, যেখানে অপরাধীরা তাদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে ভয় পায় না।

প্রকৃতপক্ষে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সম্ভবত হিসাব করে নিয়েছে যে ফৌজদারি তদন্ত না চালানোর সিদ্ধান্তে পশ্চিমা শক্তিগুলো যতই ক্ষুব্ধ হোক না কেন, তাদের ক্ষোভ কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এবং কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। এসব শক্তির উচিত সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করা।

লন্ডন, ক্যানবেরা ও অটোয়া জানিয়েছে, ডব্লিউসিকে হামলায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে তারা ‘উত্তরের সন্ধান অব্যাহত রাখবে’। কিন্তু যারা ডব্লিউসিকে হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে স্পষ্টতই আগ্রহী নয়, তাদের কাছ থেকে উত্তর খুঁজে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। বরং তাদের নিজেদেরই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

গাজায় সংঘটিত নৃশংস অপরাধের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব আইনি এখতিয়ার, দক্ষতা ও সম্পদ রয়েছে। তারা তথাকথিত সর্বজনীন এখতিয়ার বা ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন প্রয়োগ করে এটি করতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো রাষ্ট্র বিদেশে সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধ—যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা—তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনতে পারে, এমনকি অপরাধীরা বিদেশি এবং ভুক্তভোগীরাও বিদেশি হলেও। এই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে তাদের নিজ দেশের নাগরিকরাও রয়েছেন। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব ও স্বার্থ আরও স্পষ্ট।

তাহলে এখন কী হওয়া উচিত? কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার উচিত ডব্লিউসিকে হামলায় সংঘটিত সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে যৌথ ফৌজদারি তদন্তের ঘোষণা দেওয়া। তারা অন্য দেশগুলোকেও এতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানাতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ডেরও সর্বজনীন এখতিয়ার প্রয়োগের আইনি সক্ষমতা রয়েছে।

ফিলিস্তিনে যুদ্ধাপরাধের তদন্তে কানাডা ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২৪ সালে কানাডার পুলিশ গাজায় সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধের বিষয়ে একটি ‘কাঠামোগত তদন্ত’ শুরু করে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা পরবর্তীতে কানাডার এখতিয়ারে প্রবেশ করা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।

অবশ্য কোনো ফৌজদারি তদন্ত শুরু করলেই যে কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, এমন নয়। তবে নিহতদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার এটি সবচেয়ে কার্যকর সুযোগ হতে পারে। এর মাধ্যমে এমন একটি বার্তাও দেওয়া সম্ভব যে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে রাষ্ট্রগুলো প্রয়োজনীয় সম্পদ ব্যয় করতে প্রস্তুত।

এ ছাড়া কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে এবং সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তি বিদেশে ভ্রমণ করলে, তাকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে এসব দেশের কোনো একটিতে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হতে পারে।

ডব্লিউসিকে হামলার ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত বাতিলের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে অগ্রহণযোগ্য। আর যেসব দেশের নাগরিক এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন, তাদের উচিত গাজায় মানবিক সহায়তাকর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সন্দেহভাজন যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে নিজেদের ফৌজদারি তদন্ত চালানো।

সূত্র: আল জাজিরা

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন