আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩:০০, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সুর বাহের ফিলিস্তিনি গ্রামে একটি ভবন ধ্বংস করছে ইসরায়েলি বাহিনী।-ছবি: আল জাজিরা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক প্রভাব এবং মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্ব যখন গভীরভাবে ভাবছে, তখন ইসরায়েল তার সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের অংশ হিসেবে এআই ব্যবহারে এগিয়ে যাচ্ছে।
গাজায় সম্ভাব্য বোমা হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের হত্যার ব্যাপকতা বৃদ্ধিতে এটি ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রামাণ্যচিত্র ‘নাজা’-তেও এ বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরায়েল শুধু গাজায় যুদ্ধে এআই ব্যবহার করেনি, অধিকৃত পশ্চিম তীরেও এটি ব্যবহার করেছে। গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সেখানে ফিলিস্তিনি ভূমি পর্যবেক্ষণ এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ত্বরান্বিত করতে এআইকে পদ্ধতিগতভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম পালডিজিটাল মানবাধিকারকর্মী ও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইসরায়েল বিস্তীর্ণ এলাকা পর্যবেক্ষণ এবং ভূমির পরিবর্তন শনাক্ত করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর মধ্যে ইসরায়েলি অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের তৈরি ‘ইমিসাইট’ নামের একটি প্রযুক্তিও রয়েছে। পরে এসব পরিবর্তনকে স্থাপনা ধ্বংসের যৌক্তিকতা হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
পালডিজিটালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েল প্রথমে নাকাব মরুভূমিতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। সেখানে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি বেদুইন নাগরিকদের লক্ষ্য করা হয়। ইসরায়েলের অনেক বেদুইন এমন গ্রামে বসবাস করেন, যেগুলো সরকার স্বীকৃতি দেয়নি এবং কর্তৃপক্ষ সেসব এলাকায় খুব কম নির্মাণ অনুমতি দেয়। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ বৈষম্যমূলক এবং বেদুইন সম্প্রদায়কে সরিয়ে ইহুদি বসতি স্থাপনের লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি যখন ভূমির পরিবর্তন শনাক্ত করে এবং সেগুলোকে অনুমোদনহীন স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করে, তখন বুলডোজার সেখানে পাঠানো হয়।
পালডিজিটালের মতে, ইসরায়েল এখন ওই প্রযুক্তি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও নিয়ে এসেছে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর বহু বছর ধরে নিয়মিত ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এমন সব এলাকায় নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলা হয়, যেখানে ফিলিস্তিনিদের জন্য নির্মাণের অনুমতি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটির একটি প্রয়োগকারী ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম তীরে কাজ করা। ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন পিস নাও এটিকে ‘সংযুক্তিকরণের দিকে একটি পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংগঠনটি আরও বলেছে, ভূমি অধিকার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থা ‘অবৈধ দখল শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে।’
কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের ডকুমেন্টেশন ও প্রকাশনা বিভাগের প্রধান আমির দাউদ আল জাজিরাকে বলেন, এই ইউনিট প্রতিষ্ঠা একটি পরিকল্পিত উত্তেজনা বৃদ্ধির পদক্ষেপ।
দাউদ আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমরা নাকাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর পরীক্ষিত নজরদারি ও উচ্ছেদের একটি মডেল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্থানান্তরের কথা বলছি। রাজনৈতিক ঝুঁকি শুরু হচ্ছে পশ্চিম তীরের ভেতরে কাজ করার জন্য ইসরায়েল ল্যান্ড অথরিটির অধীন একটি জেলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর অর্থ হলো, একটি অধিকৃত ভূখণ্ডের ভেতরে সরাসরি ইসরায়েলি বেসামরিক সরকারি কাঠামো প্রবেশ করানো।’
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য আল জাজিরা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও ইমিসাইটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তবে তারা এখনো কোনো জবাব দেয়নি।
এজ কম্পিউটিং ও নজরদারি
ইমিসাইটের মতো এআই প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি স্যাটেলাইট প্রযুক্তির অগ্রগতিও আকাশ থেকে ধারণ করা ছবি বিশ্লেষণের গতি বাড়াচ্ছে। ফিলিস্তিনি ডিজিটাল মিডিয়া ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ খালেদ সাফি আল জাজিরাকে বলেন, প্রচলিত মানব পর্যবেক্ষণের কারণে যে সময়ের বিলম্ব হতো, তা এড়িয়ে এই প্রযুক্তি ছবি বিশ্লেষণের গতি বাড়িয়েছে। এখন নতুন প্রজন্মের স্যাটেলাইট কক্ষপথে থাকা অবস্থাতেই এআই ব্যবহার করে ছবি বিশ্লেষণ করতে পারে।
সাফি বলেন, ‘শক্তিশালী কম্পিউটার চিপ ও এআই অ্যালগরিদম যখন স্যাটেলাইটের ভেতরেই যুক্ত করা হলো, তখন কার্যত স্যাটেলাইটটি মহাকাশে কাজ করা একটি এজ কম্পিউটিং টার্মিনালে পরিণত হলো।’
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটি ছবি ধারণ করে, বিশ্লেষণ করে, পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তু শনাক্ত করে এবং এরপর ফলাফল অথবা শুধু গুরুত্বপূর্ণ অংশ পৃথিবীতে পাঠায়।’
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইমিসাইট নাকাবের ১০ হাজার ৭০০ বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা পর্যবেক্ষণে ভূমি কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করেছে। এর ফলে ইসরায়েলের ২ হাজার ৬০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বেদুইন নাগরিক জোরপূর্বক উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এখন পশ্চিম তীরে এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা মানুষের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন পিস নাও ও কেরেম নাভোট ২০১০ থেকে ২০২২ এবং ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য তুলনা করে জানিয়েছে, সম্পূর্ণ ইসরায়েলি সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন পশ্চিম তীরের এরিয়া সি এবং অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বাড়িঘর ধ্বংসের ঘটনা ৮০ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৯৬৬টি ভবন ধ্বংস করা হয়েছে। ২০২৫ সালে ধ্বংসযজ্ঞ আরও বেড়ে যায়। শুধু জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনী ১ হাজার ২৮৮টি ফিলিস্তিনি স্থাপনা ধ্বংস করেছে।
দাউদ বলেন, ‘এখানে অ্যালগরিদম একটি “ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার” হিসেবে কাজ করছে। এটি বিশাল এলাকা স্ক্যান করে, লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, সাম্প্রতিক পরিবর্তন শনাক্ত করে এবং সতর্কতা ও ধ্বংসের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত বাস্তুচ্যুতির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার, আর অ্যালগরিদম সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের খরচ কমিয়ে দেয়।’
প্রয়োগ কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা
ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের ব্যাপক অর্থায়নে পরিচালিত একটি স্থল টহল নেটওয়ার্ক থেকেও এই এআই ব্যবস্থায় তথ্য সরবরাহ করা হয়। এসব টহল অবৈধ বসতিগুলোকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কেন্দ্রে পরিণত করছে।
২০২৩ সালে ইসরায়েল সরকার বসতিস্থাপনকারীদের টহলের জন্য ৩ কোটি ৩০ লাখ শেকেল (৯ মিলিয়ন ডলার) এবং এসব বসতিতে ড্রোন ও ক্যামেরা স্থাপনের জন্য ৪ কোটি শেকেল (১৩ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করেছিল।
সাফি ‘হিউম্যান-আউট-অফ-দ্য-লুপ’ পদ্ধতির গুরুতর নৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। এই পদ্ধতিতে মানব পর্যবেক্ষণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারে।
সাফি বলেন, ‘সমস্যাটি হলো একটি জীবন-পরিবর্তনকারী সিদ্ধান্তকে শূন্য থেকে একের মধ্যে একটি সম্ভাবনার সমীকরণে, একটি সংখ্যা, একটি ছবি ও তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা।’
তিনি বলেন, ‘এর ফলে অপরাধী দায়বদ্ধতা ছড়িয়ে দিতে এবং তা এড়িয়ে যেতে পারে। দায় শেষ পর্যন্ত অ্যালগরিদম, প্রতিষ্ঠান অথবা অন্য কোনো অজ্ঞাত সত্তার ওপর গিয়ে পড়ে।’
প্রযুক্তির এই ব্যবহার নজিরবিহীন বসতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি এগিয়ে চলছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইসরায়েল সরকার ৪০ হাজারের বেশি বসতি স্থাপনের আবাসন ইউনিটের পরিকল্পনা এগিয়ে নেয় এবং ১৮৫টি নতুন বসতি স্থাপন করে—আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে এসবই অবৈধ।
অন্যদিকে একই সময়ে পশ্চিম তীরজুড়ে ১১৮টি ফিলিস্তিনি পশুপালক সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর (ওসিএইচএ) ও পিস নাওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অধিকৃত ভূখণ্ডে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। ২০২৫ সালেই ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার ঘটনায় রেকর্ড ১ হাজার ৮৩৬টি হামলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি এরিয়া সিতে একটি অনলাইন ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনসহ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষগুলো এটিকে প্রশাসনিক সংযুক্তিকরণ চূড়ান্ত করার জন্য তৈরি একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা হিসেবে নিন্দা করেছে।
এই স্বয়ংক্রিয় প্রয়োগ ব্যবস্থার স্পষ্ট দ্বৈত মানদণ্ড তুলে ধরে দাউদ এটিকে বিভাজনের একটি যন্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
দাউদ বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের ভবন দ্রুত শনাক্ত করে দ্রুত ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় ঠেলে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ঔপনিবেশিক বসতিকে অর্থায়ন করা হয়, সেবার সঙ্গে যুক্ত করা হয় এবং পরে সেটিকে পেছনের তারিখে বৈধ করার কাজ করা হয়।’
শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ইমিসাইটের ব্যবহার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য দ্বৈত ও লাভজনক উদ্দেশ্য পূরণ করছে।
সাফি সতর্ক করে বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড শুধু নজরদারির জায়গা নয়; দখলদারিত্বের জন্য এসব কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে পরিচালনার একটি অত্যন্ত স্পষ্ট পরিবেশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার অ্যালগরিদমকে প্রশিক্ষিত করছে এবং এগুলোকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বিক্রি ও বিশ্বব্যাপী বাজারজাত করার জন্য প্রস্তুত করছে।’
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং