নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০:২৫, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তোফাজ্জল হোসেন হত্যা মামলার দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার।তোফাজ্জল হোসেন হত্যা মামলার দুই বছরেও শুরু হয়নি বিচার।-ছবি: সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে মানসিক ভারসাম্যহীন যুবক তোফাজ্জল হোসেনকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার দুই বছর পূর্ণ হলেও এখনো শুরু হয়নি মামলার বিচার। বহুল আলোচিত এ ঘটনায় ২৮ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই)।
মামলার আসামিদের মধ্যে দুজন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। নয়জন জামিনে আছেন এবং ১৭ জন এখনো পলাতক। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য গত ২৩ আগস্ট দিন নির্ধারিত থাকলেও তা জমা হয়নি। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দেওয়ার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত।
বিচার শুরু না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তোফাজ্জলের মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পার হয়ে গেলেও বিচার শুরু হয়নি। তাদের পরিবার দ্রুত বিচার চায়।
মামলার বাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ বলেন, তারা প্রতিটি ধার্য তারিখে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেন। প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা তাদের।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম জানান, তদন্ত শেষে ২৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। আদালত তা গ্রহণ করেছেন এবং পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
তার ভাষ্য, অভিযোগপত্রে আসামিদের পূর্ণাঙ্গ নাম ও ঠিকানা দেওয়া হয়েছে। এখন পলাতকদের গ্রেপ্তারের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট থানার।
ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জানান, মামলাটি বিচারের উপযোগী হলে মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে। সেখানে অভিযোগ গঠনের পর সাক্ষীদের হাজির করে দ্রুত বিচার শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
যেভাবে প্রাণ হারান তোফাজ্জল
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে ফজলুল হক মুসলিম হলের গেটে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী তোফাজ্জলকে আটক করেন। পরে তাকে হলের অতিথিকক্ষে নিয়ে মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে মারধর করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদের সময় নিজের নাম তোফাজ্জল বলে জানান তিনি। পরে তার আচরণ দেখে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারেন তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। এরপর তাকে হলের ক্যান্টিনে নিয়ে খাবার খাওয়ানো হয়।
খাবার খাওয়ানোর পর তাকে আবার হলের দক্ষিণ ভবনের অতিথিকক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে জানালার সঙ্গে তার হাত বেঁধে স্ট্যাম্প, হকিস্টিক ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন তোফাজ্জল। পরে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। ভিডিওতে মারধরের আগে তোফাজ্জলকে খাবার খাওয়ানোর দৃশ্যও দেখা যায়।
তোফাজ্জলকে আটকে মারধর করা হচ্ছে জানতে পেরে তার মামাতো বোন তানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর নম্বরে ফোন করে তাকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। একই সঙ্গে তোফাজ্জল মানসিক ভারসাম্যহীন বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। তবে তার অনুরোধে কাজ হয়নি বলে অভিযোগ করেন তানিয়া।
মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র
হত্যাকাণ্ডের পরদিন শাহবাগ থানায় মামলা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার আমানুল্লাহ। ওই মামলার তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর ২১ শিক্ষার্থীকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় শাহবাগ থানা পুলিশ।
তবে ওই অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পরে ঢাকার তৎকালীন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেন।
পুনঃতদন্ত শেষে পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম ২৮ জনকে আসামি করে নতুন অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ১০ মার্চ আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
অভিযোগপত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হল শাখার সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জালাল মিয়াসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের নাম রয়েছে। এ মামলায় জালাল মিয়া ও সুমন মিয়া কারাগারে আছেন। নয়জন জামিনে এবং ১৭ জন পলাতক রয়েছেন।
তোফাজ্জলের পারিবারিক জীবন
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাঁঠালতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন তোফাজ্জল। বরিশাল বিএম কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করলেও মানসিক অসুস্থতার কারণে কর্মজীবনে যুক্ত হতে পারেননি।
পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর পর তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে বলে জানান স্বজনরা। প্রায় আট বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা মারা যান। এরপর কয়েক বছর পর মারা যান মা। তার বড় ভাই নাসির হোসেন পুলিশের উপপরিদর্শক ছিলেন এবং তিনি তোফাজ্জলের দেখাশোনা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন।
তবে ২০২৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তোফাজ্জল কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েন। স্বজনরা তাকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করলেও নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। এরপর তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন।
ব্রেকিং