রংপুরে গণপতি পরিবার হত্যা

ময়নাতদন্তে মা-মেয়েকে ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২০:১০, ২৬ আগস্ট ২০২৬

ময়নাতদন্তে মা-মেয়েকে ধর্ষণের প্রমাণ মেলেনি

রংপুরে গণপতি পরিবার হত্যায় মা-মেয়েকে ধর্ষণের কোনো আলামত মেলেনি। ছবি: সংগৃহীত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।

তবে নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের সময় সংগ্রহ করা নমুনার পরীক্ষাতেও যৌন নির্যাতনের প্রমাণ মেলেনি বলে জানিয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস।

বুধবার সাংবাদিকদের তিনি জানান, চারটি মরদেহ পরীক্ষা করে যৌন নির্যাতনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনাতেও ধর্ষণের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এদিকে চারজনের ময়নাতদন্ত নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক ডোমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই বক্তব্যে দুই নারী মরদেহের শরীরে শুক্রাণু পাওয়ার দাবি করা হয়েছিল।

তবে চিকিৎসক বাবলু কিশোর বিশ্বাস এই দাবি সরাসরি নাকচ করেন। তিনি জানান, মরদেহ থেকে সংগ্রহ করা সোয়াব মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফলে এ ধরনের কোনো আলামতের উল্লেখ নেই। তাই ময়নাতদন্তের ভিত্তিতে ধর্ষণের বিষয়টি বাদ দেওয়া যায়।

ডোম এমন দাবি কেন করেছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসক বলেন, নমুনা সংগ্রহের সময় তার এমন ধারণা হয়ে থাকতে পারে যে পরীক্ষার ফলাফলে কোনো আলামত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো প্রমাণ মেলেনি।

নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। এর আগে তিনি নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরে মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন।

প্রায় তিন বছর ধরে ওই বাড়ির দোতলায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন গণপতি। বাড়িটির নিচতলার নির্মাণকাজ তখনও সম্পূর্ণ হয়নি। অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসাও করতেন।

শনিবার রাতে ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী এবং ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত গণপতির বয়স ৬০ বছর, প্রীতিলতার ৫০, আগামী ২৫ এবং প্রীয়মের বয়স ১২ বছর।

পুলিশ প্রাথমিকভাবে সুরতহাল প্রতিবেদনে চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার কথা জানিয়েছিল। ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরাও একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানান, মরদেহগুলো উদ্ধারের সময় বেশ কিছুটা ফুলে গিয়েছিল এবং পচন ধরেছিল। ফলে স্বাভাবিক অবস্থার মতো শারীরিক চিহ্ন স্পষ্ট ছিল না। তবে চারজনের গলায় আঘাতের দাগ পাওয়া গেছে। মাথা ও বুকেও কারও কারও আঘাতের চিহ্ন ছিল। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে মত দেন তিনি।

চারটি মরদেহের কোনোটিতেই কাটা বা ছেঁড়া ধরনের আঘাত পাওয়া যায়নি। যেসব আঘাতের চিহ্ন ছিল, সেগুলো মূলত ফোলা বা আঘাতজনিত পরিবর্তন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চারজনের মুখে পোড়া দাগ থাকার যে আলোচনা চলছে, সেটিও সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। তার ব্যাখ্যা, মৃত্যুর পর সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহের ত্বকে স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে। পচন প্রক্রিয়ার কারণে ত্বক কালচে হয়ে যেতে পারে এবং তখন মুখ ও শরীরও কালো দেখাতে পারে। এর জন্য কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।

এ ঘটনায় নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে রোববার কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

একই দিন ভোরে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস নামে দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই রাতেই তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

মঙ্গলবার তাদের বন্ধু সীমান্ত আদালতে সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার রাতে মুগ্ধ, সিদ্ধার্থ ও সীমান্ত একসঙ্গে ইয়াবা সেবন করেছিলেন।

পরবর্তীতে মামলাটির তদন্ত কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছ থেকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলী মামলাটি তদন্ত করছেন। 

আরও পড়ুন