ইরান যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ অনিশ্চিত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৩:২১, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরান যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ অনিশ্চিত

ওমানের মুসান্দাম থেকে দেখা হরমুজ প্রণালিতে চলাচলরত জাহাজগুলো। ছবি: আল জাজিরা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতের কারণে সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের (PIIE) নতুন এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সোমবার প্রকাশিত ১৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। তাদের প্রতিরক্ষা, জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যে আরও বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর তাদের আস্থাও কমেছে।

বিশ্ব অর্থনীতির তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাব অনেক বেশি পড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ০.৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়েছে। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ক্ষেত্রে এই কাটছাঁট ছিল অনেক বেশি।

কাতারের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১৪.৭ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে ৮.৬ শতাংশ করা হয়েছে। সৌদি আরবের পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৭ শতাংশ এবং ইউএইর পূর্বাভাস ৫.৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১.৭ শতাংশ করা হয়েছে।

PIIE বলছে, তাৎক্ষণিক অর্থায়ন সংকট এড়াতে উপসাগরীয় সরকারগুলোর পর্যাপ্ত আর্থিক সম্পদ ও ঋণ নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক চাপের কারণে তারা যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের পরিবর্তে দেশের অভ্যন্তরে ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের আগেই সৌদি আরব অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে ঝুঁকেছিল। সংঘাত সেই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।

সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) গত ছয় বছরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের অংশ ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে এনেছে।

বিনিয়োগ বিলম্বে বাড়তে পারে মার্কিন চাপ

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে হোয়াইট হাউস থেকে অতিরিক্ত চাপ আসতে পারে। এর আগে বিভিন্ন দেশের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দেরি হলে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়নে দক্ষিণ কোরিয়ার আইনসভার বিলম্বের কথা উল্লেখ করে দেশটির পণ্যে শুল্ক বাড়ানোর হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অগ্রগতি হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোর সম্প্রসারণে সহায়তার জন্য দক্ষিণ কোরিয়া ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের একটি জ্বালানি বিনিয়োগ চুক্তির কাছাকাছি রয়েছে।

কাতারও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ অব্যাহত রেখেছে। কাতারএনার্জি মার্চে টেক্সাসের একটি স্থাপনায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন শুরু করে এবং এপ্রিল থেকে রপ্তানি শুরু করে।

ইরানের হামলায় কাতারের এলএনজি স্থাপনার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর তা পূরণে কাতারএনার্জি ২০৩১ সাল পর্যন্ত কয়েকটি মার্কিন এলএনজি উৎপাদনকারীর সঙ্গে চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

বিনিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে

PIIE বলেছে, বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিগুলোর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, সময়সীমা ও পরিমাপের পদ্ধতি না থাকায় দেশগুলো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে কি না, তা নির্ধারণ করা কঠিন হতে পারে।

এসব চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিয়োগের অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তাগত প্রভাব, শাসনব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে ইউএই-সমর্থিত একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান বিন্যান্সে ২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই চুক্তিতে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের ইস্যু করা একটি স্টেবলকয়েন ব্যবহার করা হয়েছিল।

এ নিয়ে ২০২৫ সালের জুনে ম্যাসাচুসেটসের সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও ওরেগনের সিনেটর জেফ মার্কলি আর্থিক সম্পর্কের বিষয়ে নথি চেয়েছিলেন।

এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প বিন্যান্সের প্রতিষ্ঠাতা চ্যাংপেং ঝাওকে ক্ষমা করেন। অর্থপাচারবিরোধী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৩ সালে ঝাও দোষ স্বীকার করেছিলেন।

এ ছাড়া সৌদি আরব, ইউএই ও কাতারের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বড় করপোরেট চুক্তিতে অর্থায়নে যুক্ত হওয়া নিয়েও আইনপ্রণেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

PIIE-এর প্রতিবেদনের মূল প্রশ্ন এখন—সৌদি আরব, কাতার ও ইউএই তাদের যুক্তরাষ্ট্রে দেওয়া বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে কি না এবং করলে কীভাবে করবে। 
 

সূত্র: আল জাজিরা

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন