রুশ হামলায় চাপে ইউক্রেনের অর্থনীতি, বাড়ছে বাজেট সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:০৯, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রুশ হামলায় চাপে ইউক্রেনের অর্থনীতি, বাড়ছে বাজেট সংকট

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা।ছবি: রয়টার্স

রুশ হামলায় অবকাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইউক্রেন ভয়াবহ শীতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির বাজেট সংকটও আরও গভীর হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা।

ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রী ওলেক্সান্দর ক্রাভচেঙ্কো জানিয়েছেন, চলতি বছর রুশ বিমান হামলায় দেশটির অবকাঠামো ও স্থায়ী সম্পদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। হামলা এবং দেশটির বন্দর কার্যত অবরুদ্ধ থাকার কারণে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিয়েভে অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনে বিনিয়োগকারী, সরকারি কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের উদ্দেশে ক্রাভচেঙ্কো বলেন, সামনে ইউক্রেনের জন্য খুব কঠিন একটি শীত অপেক্ষা করছে। রুশ হামলায় প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও সংকটের দিকে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এই সংকট এমন সময়ে তৈরি হয়েছে যখন ইউক্রেনের বাজেট ও সরকারি ব্যয়ের সক্ষমতা ইতোমধ্যে অত্যন্ত সীমিত।

রপ্তানি আয় নিয়ে বড় শঙ্কা

রুশ হামলার পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ইউক্রেনের রপ্তানি খাতও বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।

ক্রাভচেঙ্কোর হিসাবে, বন্দর অবরোধের কারণে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় ঝুঁকিতে রয়েছে। ইউক্রেনের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে কৃষিপণ্য, লোহা ও ইস্পাত। এসব পণ্য মূলত কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলা বাড়িয়েছে। এর ফলে দেশটির সমুদ্রবন্দর ও সরবরাহব্যবস্থা আরও চাপের মুখে পড়েছে।

বাজেট রাজস্বেও ঘাটতি

রুশ হামলায় অবকাঠামো ও শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ও লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কমে গেছে।

দেশটির পার্লামেন্টের বাজেট কমিটির প্রধান রোকসোলানা পিদলাসা জানান, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে অভ্যন্তরীণ বাজেট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার কম হয়েছে। এর প্রায় এক-চতুর্থাংশ ঘাটতি শুধু আগস্ট মাসেই হয়েছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধের ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে ইউক্রেন এখন আর আগের মতো শুধু অভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে তার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পুরোটা মেটাতে পারছে না।

প্রতিরক্ষায় ৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়

২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউক্রেন প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৪২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এই হিসাবের মধ্যে পণ্য বা সামরিক সরঞ্জাম হিসেবে পাওয়া সহায়তা ধরা হয়নি।

অন্যদিকে একই সময়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় এবং স্থানীয় ঋণ থেকে দেশটি পেয়েছে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের তুলনায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার কম।

পিদলাসা বলেন, যুদ্ধের ব্যয় এত বেড়েছে যে ইউক্রেন এখন নিজেদের অংশের ব্যয়ও পুরোপুরি বহন করতে পারছে না।

প্রতিদিন যুদ্ধের ব্যয় ১৯ কোটি ডলার

ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনার দৈনিক ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

পিদলাসার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে প্রতিদিন যুদ্ধের পেছনে প্রায় ১৯ কোটি ডলার ব্যয় হচ্ছে। ২০২৪ সালে এই ব্যয় ছিল প্রায় ১৪ কোটি ডলার।

ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

মূল্যস্ফীতি
সেনাসদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি
নিহত সেনাদের পরিবারের জন্য বাড়তি সামাজিক সহায়তা
গোলাবারুদের ব্যবহার বৃদ্ধি

ফলে ইউক্রেনের ওপর আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

বছরের শেষ পর্যন্ত অর্থের ঘাটতির আশঙ্কা

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খাতে চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত আরও অর্থের প্রয়োজন হবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার সামরিক নয় এমন কিছু বাজেট ব্যয় কমানো বা পিছিয়ে দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।

একই সঙ্গে পশ্চিমা অংশীদারদের কাছ থেকে আরও আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে কিয়েভ। তবে এখন পর্যন্ত দ্রুত ও সুস্পষ্ট কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

সামনে কঠিন শীত

ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো আসন্ন শীত। রাশিয়ার হামলায় বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শীতকালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে যুদ্ধের সম্মুখসারিতে বড় ধরনের অগ্রগতি না থাকলেও রাশিয়া ও ইউক্রেন সাম্প্রতিক সময়ে একে অপরের লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, বন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও অন্যান্য অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা বাড়িয়েছে। এর লক্ষ্য প্রতিপক্ষের যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা দুর্বল করা। 

সূত্র: রয়টার্স

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন