আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭:১৯, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকীতে নিউইয়র্কে ইসলামবিরোধী সমাবেশে স্লোগান দিচ্ছেন এক উগ্র ডানপন্থি কর্মী। ছবি: আল জাজিরা
৯/১১ হামলার ২৫ বছর পরও ওই হামলার পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইউরোপের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে। সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ বা ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ (GWOT) ইউরোপের উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর রাজনৈতিক উত্থানের পথ অনেকটাই সহজ করে দেয়।
২০০১ সালের পর বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও নীতিমালা ইউরোপে আগে থেকেই বাড়তে থাকা মুসলিমবিরোধী বর্ণবাদকে আরও বৈধতা দেয়।
৯/১১-এর আগে ইউরোপের বহু দেশে উগ্র ডানপন্থি দলগুলো মূলধারার রাজনীতিতে অনেকটাই প্রান্তিক ছিল। কোনো কোনো দল নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য ভোট পেলেও তাদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে বর্জিত বা ক্ষমতার বাইরে ছিল। তাদের পরিচিতি ছিল মূলত ইহুদিবিদ্বেষ, বর্ণবাদ এবং ফ্যাসিবাদী অতীতের প্রতি প্রকাশ্য নস্টালজিয়ার কারণে।
তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। উগ্র ডানপন্থিরা ইসলামকে তাদের নতুন ‘ভেতরের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করতে থাকে। ফ্রান্সের ফ্রন্ট ন্যাশনাল এবং অস্ট্রিয়ার ফ্রিডম পার্টির মতো দলগুলো আরব, কৃষ্ণাঙ্গ ও তুর্কিদের নিয়ে মুসলিমবিরোধী বক্তব্য জোরালো করে। নেদারল্যান্ডসেও ১৯৯০-এর দশকে ইসলামকে উদার গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এরপর আসে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলা। আল-কায়েদার ১৯ সদস্য চারটি বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন ও পেনসিলভানিয়ার একটি স্থানে হামলা চালায়। এতে ২ হাজার ৯৭৭ জন নিহত হন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এরপর ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন।
এই যুদ্ধের পর মুসলিমদের নিয়ে নেতিবাচক রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের বক্তব্য আরও বিস্তৃত হয়। যদিও বুশ বলেছিলেন, যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে নয়, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে; বাস্তবে পরবর্তী নীতি ও বক্তব্যে অনেক সময় ইসলাম ও মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে।
আফগানিস্তান ও ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে ইউরোপের একাধিক দেশ অংশ নেয়। একই সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের নিয়ে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতি, নজরদারি ও উগ্রবাদ দমন কর্মসূচি চালু হয়। ব্রিটেনের ‘প্রিভেন্ট’ কর্মসূচি এর অন্যতম উদাহরণ।
মাদ্রিদ ও লন্ডনে আল-কায়েদা-সংশ্লিষ্ট হামলার পর ইউরোপে মুসলিমদের নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। পাশাপাশি গুয়ানতানামো বে-সহ বিভিন্ন গোপন আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ কার্যক্রমও মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করে।
পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন ইসলামবিরোধী সংগঠন ও ব্যক্তির মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে। তারা ‘কাউন্টার-জিহাদ মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত একটি আন্তঃদেশীয় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তাদের বক্তব্য ছিল, ইসলাম পশ্চিমা সভ্যতার জন্য হুমকি।
ধীরে ধীরে এই মুসলিমবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান নির্বাচনী সাফল্যও পেতে শুরু করে। অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ডস, ইতালি, নরওয়ে, পোল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থি দল সরকারে অংশীদার হয়। ডেনমার্ক ও সুইডেনে তারা সরাসরি সরকারে না থেকেও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে।
এর পাশাপাশি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ বাড়তে থাকে। কোথাও মুখঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়, কোথাও শিক্ষক, শিক্ষার্থী বা সরকারি কর্মীদের হিজাব পরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কিছু দেশে মসজিদ নির্মাণ নিয়েও কঠোর নিয়ম করা হয়েছে।
নিরাপত্তাকেন্দ্রিক এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম নেতৃত্বাধীন সংগঠন ও নাগরিক সমাজের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন দেশে মসজিদ ও মুসলিম সংগঠনের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ‘রাজনৈতিক ইসলাম’, ‘ইসলামপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদ’সহ বিভিন্ন ধারণার মাধ্যমে এসব পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৯/১১-পরবর্তী ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ যে রাজনৈতিক ভাষা ও কাঠামো তৈরি করেছিল, তা ইউরোপের উগ্র ডানপন্থিদের জন্য মুসলিমবিরোধী রাজনীতিকে মূলধারায় নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করে। এর সঙ্গে ইউরোপের উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ ও ফ্যাসিবাদী অতীতের যথেষ্ট হিসাব-নিকাশ না হওয়ার বিষয়টিও ইসলামবিদ্বেষের বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং