দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯:১৪, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, এক মাইলের বেশি সুড়ঙ্গ ধ্বংস-ছবি/ বিবিসি

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর পরিচালিত একটি বড় ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তাদের দাবি, আলি তাহের রিজের নিচে থাকা দুটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করতে ১ হাজার টনের বেশি বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে।

ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, সুড়ঙ্গ দুটির মোট দৈর্ঘ্য ছিল ২ কিলোমিটারের বেশি। বিস্ফোরণের পর ভূমিকম্পের মতো কম্পন সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১।

হিজবুল্লাহ বা লেবাননের সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইসরায়েলি বাহিনী গত সপ্তাহে কয়েক মাসের সংঘর্ষের পর আলি তাহের রিজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর সেখানে থাকা হিজবুল্লাহর অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযান চালানো হয়।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) প্রকাশিত ভিডিও ও ছবিতে বিস্ফোরণের পর আকাশ আলোকিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। রিজটির প্রায় ৬ কিলোমিটার পশ্চিমে নাবাতিয়েহ শহরের বাসিন্দা আহমেদ বলেন, বিস্ফোরণের প্রায় ১৫ সেকেন্ড পর ভয়ংকর শব্দ শোনা যায় এবং পুরো বাড়ি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে।

তিনি জানান, মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করছিল, শিশুরা কাঁদছিল এবং অনেকে গাড়ি নিয়ে বৈরুতের দিকে চলে যাচ্ছিল। প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরে উপকূলীয় শহর সাইদাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।

ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় অস্ত্র থাকার দাবি

আইডিএফের দাবি, ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটিতে হিজবুল্লাহর বদর ইউনিটের একটি কমান্ড সেন্টার ছিল। সেখানে কয়েক ডজন রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাশাপাশি ট্যাংকবিধ্বংসী অস্ত্র, মাইন ও বিস্ফোরক মজুত ছিল।

ইসরায়েলি বাহিনী আরও দাবি করেছে, এই অবকাঠামো দুই দশক ধরে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং ইরানের অর্থায়ন ও পরিকল্পনায় এটি তৈরি করা হয়।

আইডিএফের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থাপনার ভেতরে থাকা হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা নিহত হয়েছে অথবা পালিয়ে গেছে।

ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, এই কমপ্লেক্স ধ্বংসের মধ্য দিয়ে ওই এলাকায় আটটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস এবং একটি ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার অভিযান সম্পন্ন হয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে হামলা

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থান লক্ষ্য করে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান আরও জোরদার হওয়ার মধ্যেই সর্বশেষ এই অভিযান চালানো হলো। ইসরায়েল সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নিজেদের ঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চল ধরে রেখেছে।

লেবাননের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়েহ আল-ফাওকা ও টায়ার জেলার মানসুরিতেও ইসরায়েলি হামলা হয়েছে।

এদিকে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এলাকাগুলোতে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন বাড়িয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এমটিভি জানিয়েছে, স্থিতিশীলতা বাড়ানো ও বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করতে নাবাতিয়েহ শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।

সংঘাতে বাস্তুচ্যুত ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ

২ মার্চ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার পর প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালালে লেবাননও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালায় এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশে স্থল অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো লেবাননের প্রায় ৫ শতাংশ ভূখণ্ড দখলে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং লেবানন ও ইসরায়েলের পৃথক সমঝোতার পর সংঘর্ষ কিছুটা কমে আসে। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলা ও স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, সংঘাতের কারণে লেবাননে এখনো প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত রয়েছে। ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা, বিমান হামলা, ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ফেরার ওপর বিধিনিষেধের কারণে তাদের অনেকেই বাড়ি ফিরতে পারছেন না।

লেবানন-ইসরায়েল সমঝোতা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর অস্ত্র ত্যাগ, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ধীরে ধীরে প্রত্যাহার এবং ওই এলাকায় লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহ সরাসরি এই চুক্তিতে অংশ নেয়নি এবং সরাসরি আলোচনাও প্রত্যাখ্যান করেছে।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২ মার্চ থেকে ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে অন্তত ৪ হাজার ৩৮৩ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৩৯৫ জন নারী ও ২৫৯ জন শিশু রয়েছে। এই হিসাবে বেসামরিক ও যোদ্ধাদের আলাদা করা হয়নি।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহেই অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, একই সময়ে দেশটির ৪০ জন সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। 

সূত্র: বিবিসি

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন