আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩:১৩, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাশিয়া ও ইউক্রেন ইতোমধ্যেই কিছু স্বায়ত্তশাসিত সক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন ব্যাপকহারে ব্যবহার করছে। ছবি: আল জাজিরা
রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং হামলার সমন্বয়ে এআইনির্ভর ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ড্রোন ব্যবহারের দিকেও এগোচ্ছে দুই দেশ।
এরই মধ্যে ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর জাপোরিঝঝিয়ায় রুশ ড্রোন হামলায় এক তরুণীর মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ৬ জুলাই একটি গ্যাস স্টেশনে রুশ ড্রোন বিস্ফোরণের পর ১৮ বছর বয়সী হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী তেতিয়ানা বুবিনেতস মাটিতে পড়ে যান। বিস্ফোরণের তীব্র অভিঘাত ও ড্রোনের ছিটকে আসা ধাতব টুকরোর আঘাতের পরও তার শরীরে দৃশ্যমান আঘাত খুব বেশি ছিল না, শুধু নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে আরও দুই বেসামরিক নাগরিকের সঙ্গে তার মৃত্যু হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ উদ্ধৃত করে আল-জাজিরা জানিয়েছে, ওই হামলাটি রাশিয়ার এআইচালিত সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় আক্রমণাত্মক ড্রোন ব্যবহারের প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা ধ্বংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখতে পান, ড্রোনটিতে প্রচলিত অ্যান্টেনার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়ার তৈরি একটি এআই-চালিত মিনি কম্পিউটার ছিল।
এই কম্পিউটারের মাধ্যমে ড্রোনটি নিজে থেকে তার নির্ধারিত লক্ষ্য শনাক্ত করতে, সেই লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে এবং হামলা চালাতে সক্ষম ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ড্রোনের লক্ষ্য ছিল গ্যাস স্টেশনের প্রোপেনের ট্যাংক।
শুধু ড্রোন নয়, বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের কাঠামো
বিশ্লেষকদের মতে, এআইচালিত ড্রোন মূলত আরও বড় একটি প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধব্যবস্থার অংশ। রাশিয়া ও ইউক্রেন এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যার মাধ্যমে নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ এবং আক্রমণের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
কিংস কলেজ লন্ডনের প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষক মারিনা মিরনের মতে, বিষয়টি শুধু ড্রোনে এআই যুক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ড্রোনের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য একটি সফটওয়্যার ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। সেই ব্যবস্থা জিপিএস তথ্য ও যুদ্ধক্ষেত্রের সরাসরি মানচিত্র বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট সামরিক ইউনিটকে লক্ষ্য সম্পর্কে তথ্য দিতে পারে।
এই ধরনের ব্যবস্থাকে ‘রিকনেসাঁস-স্ট্রাইক আর্কিটেকচার’ বলা হচ্ছে। এটি অনেকটা কেন্দ্রীয় কমান্ড ব্যবস্থার মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে নিজেদের বাহিনীর অবস্থান পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করা যায়।
এআই বিপুল পরিমাণ তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করে তুলছে। ফলে লক্ষ্য শনাক্ত করা থেকে শুরু করে তা অনুসরণ এবং ধ্বংস করার পুরো প্রক্রিয়া কয়েক মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করার সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রিয়া উভয়েই এগোচ্ছে
ইউক্রিয়া ‘ডেল্টা’ নামে নিজস্ব একটি যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা তৈরি করছে। অন্যদিকে রাশিয়া ‘সভোদ ট্যাকটিক্যাল সিচুয়েশনাল অ্যাওয়ারনেস কমপ্লেক্স’ নামে একটি ব্যবস্থা সামনের সারির ইউনিটগুলোতে ব্যবহার শুরু করেছে।
দুই পক্ষের দাবি, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পর একটি ‘ডিসিশন সাপোর্ট সিস্টেম’ সামরিক কমান্ডারকে সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের বিভিন্ন বিকল্প দেয়। এতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের ভূমিকা থাকার কথা।
তবে বাস্তবে মানুষ কতটা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। গবেষকদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপের মধ্যে সামরিক কমান্ডাররা অনেক সময় এআইয়ের পরামর্শ অনুসরণ করতে পারেন। ফলে এআই পরোক্ষভাবে মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে।
পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হামলার দিকে
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ মনে করেন, ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে নেভিগেশন, লক্ষ্য খোঁজা এবং হামলা—সবকিছুই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
ইতোমধ্যে কিছু ড্রোনে সীমিত স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতা ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘপাল্লার হামলার শেষ ধাপে এ প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে। ইলেকট্রনিক যুদ্ধের কারণে ড্রোনের সঙ্গে অপারেটরের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এআই-চালিত অনবোর্ড ব্যবস্থা ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। এরপর এটি নিজে লক্ষ্য শনাক্ত করে হামলা সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়।
ইউক্রেনীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান দ্য ফোর্থ ল-এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়ারোস্লাভ আজনিউক বলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেন শুধু একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ড্রোন তৈরির প্রতিযোগিতায় নেই; বরং নির্ভরযোগ্য, কম খরচের এবং ব্যাপকভাবে ব্যবহারযোগ্য স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে।
তার মতে, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, দীর্ঘ দূরত্বের হামলা এবং বিপুলসংখ্যক ড্রোনের ব্যবহার মানবনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে ক্রমেই সীমিত করে দিচ্ছে। আগামী ছয় থেকে ১২ মাসে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো ভুল লক্ষ্য শনাক্ত করার ঝুঁকি। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) গবেষক কাতেরিনা বন্ডার বলেন, এআই নিজে কোনো কিছুর অর্থ বোঝে না; মানুষের তৈরি অ্যালগরিদম ও নিয়ম অনুসরণ করেই কাজ করে।
একটি বাস ও একটি ট্যাংকের মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করার প্রযুক্তি তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হলেও বেসামরিক ব্যক্তি ও যোদ্ধার মধ্যে সঠিক পার্থক্য করা অনেক বেশি কঠিন।
এ ছাড়া এ ধরনের ড্রোনে ব্যবহৃত ক্যামেরার মান অনেক সময় সীমিত থাকে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় ছবির মান আরও খারাপ হতে পারে। ফলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ভুলভাবে কোনো বেসামরিক ব্যক্তি বা বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য হিসেবে শনাক্ত করার আশঙ্কা রয়েছে।
এই কারণে এআইনির্ভর অস্ত্র ব্যবহারে ভুল হলে তার দায় কার—মানুষের, নাকি প্রযুক্তির—তা নিয়েও বড় ধরনের নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের এই প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা তাই শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের কৌশল পরিবর্তন করছে না; একই সঙ্গে ভবিষ্যতের যুদ্ধে মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করছে।
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং