আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:১৪, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয় নিরাপত্তা হুমকিতে ফেললে ৩ বছর পর্যন্ত বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা হতে পারে চীনা নাগরিকদের-ছবি/ বিবিসি
চীনের নাগরিকদের বিদেশ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণে নতুন বিধি কার্যকর হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ডের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশে থাকাকালে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বা স্বার্থের ক্ষতি করেছেন বলে বিবেচিত নাগরিকরা দেশে ফেরার পর সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত চীন ছাড়তে পারবেন না। প্রযুক্তি আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করলেও কাউকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন বিধির উদ্দেশ্য “জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা”। সাধারণ নাগরিকদের বিদেশ ভ্রমণে এতে কোনো বাধা তৈরি হবে না বলেও দাবি করেছে তারা।
তবে সমালোচকদের আশঙ্কা, বিদেশে চীনা নাগরিকদের কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যের ওপর চাপ প্রয়োগে নতুন বিধি বেইজিংকে আরও ক্ষমতা দেবে।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এশিয়ান ল-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক টম কেলগ বিবিসি চাইনিজকে বলেন, এটি চীনা নাগরিকরা বিদেশে কী করেন বা কী বলেন, তা নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি আরেকটি হাতিয়ার।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে চীনা সরকারের সমালোচনা ঠেকানো বা অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ কখনও কখনও সরাসরি পাসপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
চীনা সরকারের গুজব খণ্ডনকারী প্ল্যাটফর্ম পিয়াও জানিয়েছে, মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে নিয়ে যাওয়া, অবৈধ জুয়া ও প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের মতো সমস্যা মোকাবিলায় নতুন বিধি করা হয়েছে। তাদের দাবি, সাধারণ নাগরিকদের ভ্রমণ সীমিত করা নয়, বরং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য ও অস্বাভাবিক ভ্রমণপথের ক্ষেত্রে এটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
তবে কয়েকজন চীনা নাগরিক জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরেই অস্পষ্ট ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছেন।
২৬ বছর বয়সী এক নাগরিক, ছদ্মনাম পিপি, বিবিসি চাইনিজকে জানান, ২০২৩ সালে তার পাসপোর্টের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০১৯ সালে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। বিক্ষোভ চলাকালে হংকংয়ের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পর চীনে ফেরার সময় তাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল।
পিপির ভাষ্য, একজন অভিবাসন কর্মকর্তা তাকে বলেছিলেন, “হংকংয়ের বিষয়টির কারণে” তিনি পাসপোর্ট পাবেন না। তবে এ বিষয়ে তাকে কোনো লিখিত কারণ দেওয়া হয়নি।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীনা নাগরিকরা নিজেরা অনলাইনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে তাদের ওপর বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, তা যাচাই করতে পারেন না। সাধারণত পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা কিংবা দেশ ছাড়ার চেষ্টা করার সময় তারা বিষয়টি জানতে পারেন।
নতুন বিধির আওতায় সীমান্ত কর্মকর্তাদের এখন ‘উচ্চঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত দেশ ও অঞ্চলে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।
এদিকে চীনের সরকারি ও রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মীও আগে থেকেই বিদেশ ভ্রমণে নানা বিধিনিষেধের মুখে ছিলেন। বেইজিংয়ের একটি রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিয়াও ওয়াং জানান, তার সহকর্মীদের দীর্ঘদিন ধরে পাসপোর্ট জমা রাখতে এবং বিদেশ ভ্রমণের আগে অনুমতি নিতে হয়।
তার দাবি, ব্যবস্থাপকদের পক্ষ থেকে কর্মীদের মৌখিকভাবে বলা হয়েছে, জাপানের মতো ‘সংবেদনশীল দেশগুলোতে’ ভ্রমণ করা যাবে না।
আইন বিশেষজ্ঞ টম কেলগ চীনের ক্রমবর্ধমান ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে “গভীরভাবে উদ্বেগজনক” বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এগুলো চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের অধীনে বাড়তে থাকা আদর্শিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিফলন।
তিনি বলেন, এসব বিধিনিষেধ চীনের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন মাও সেতুংয়ের শাসনামলে দেশটি অনেকটাই বাইরের বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল।
সূত্র: বিবিসি
ব্রেকিং