আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯:০৬, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনের আল-হাজমের কাছে হুথিদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর একটি ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণ। ছবি: আল জাজিরা
ইয়েমেনের বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথি বিদ্রোহী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। কৌশলগত বন্দরনগরী মোচা পুনর্দখলের চেষ্টা করছে সরকারি বাহিনী। কয়েক দিন আগে ইরান-সমর্থিত হুথিরা শহরটি দখল করে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করেছে।
হুথিরা, যারা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত, দাবি করেছে সৌদি আরব গত ৪৮ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ১০০টির বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে।
সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন করছে। দেশটির সরকার সর্বশেষ সংঘাতকে ‘বেঁচে থাকার লড়াই’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মোচা ও মায়ুন দখল
শনিবার ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী জানায়, লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা সাবা জানিয়েছে, মোচা বন্দরসংলগ্ন এলাকায় হুথিদের যানবাহন ও অস্ত্র ধ্বংস এবং বেশ কয়েকজন যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করা হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আবদুল্লাহ আল-নাজিলি জানান, মোচা থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে মোচা-দুবাব সড়কেও হুথিদের যানবাহন ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার হুথিরা মোচা দখল করে। পরদিন তারা মায়ুন দ্বীপও দখলে নেয়। এর ফলে বাব আল-মান্দাব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে। বৈশ্বিক তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি লোহিত সাগরের সঙ্গে যুক্ত।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের সদস্য ও মারিবের গভর্নর সুলতান আল-আরাদা বলেন, পশ্চিম উপকূল থেকে সরে যাওয়া সরকারি বাহিনী বর্তমানে মারিবে পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং তারা আবার যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরবে।
তিনি হুথিদের বিরুদ্ধে শান্তি প্রক্রিয়া ভেস্তে দেওয়া এবং ইয়েমেনে আবার যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন। সরকারি বাহিনীর চূড়ান্ত লক্ষ্য রাজধানী সানা পুনর্দখল করা বলেও জানান তিনি।
এদিকে সরকারি বাহিনীর রিজার্ভ ন্যাশন শিল্ড ফোর্স দাবি করেছে, সংঘর্ষের সময় তাদের ষষ্ঠ ব্রিগেড পাঁচটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
কোথায় কোথায় লড়াই চলছে
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। মোচা ও হোদেইদাহ এলাকায় হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও কৌশলগত অঞ্চলগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
তাইজ প্রদেশেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ব্যাপক স্থলযুদ্ধ ও পাল্টা হামলা হয়েছে। অন্যদিকে মারিব ও আল-জাওফ এলাকায় সরকারি বাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা ও আরও বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া হুথি নিয়ন্ত্রিত উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল ধালেয়াও সংঘাতের সক্রিয় ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে।
৮২ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত
নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর মানবিক পরিস্থিতিও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে লড়াইয়ের কারণে ৮২ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় দুই হাজারের বেশি ইয়েমেনি জিবুতিতে পৌঁছেছে। মোচা দখলের পর সেখানে থাকা জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলোর মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের সংঘাত
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুথিরা দক্ষিণ সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান শহরে বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলার দাবি করা হয়। এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন আহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
রোববার হুথিরা দাবি করে, তারা দক্ষিণ নাজরান প্রদেশের শারুরাহ এলাকায় সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে।
হুথি সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, হামলায় অস্ত্রের গুদাম এবং কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র লক্ষ্য করা হয়েছে।
অন্যদিকে সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, শনিবার দক্ষিণাঞ্চলীয় জাজান এলাকায় হুথিদের ছোড়া একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানলে দুইজন আহত হন। একটি মসজিদ ও কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সৌদির ১২৯ বিমান হামলার দাবি
হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেছেন, সৌদি যুদ্ধবিমান গত ৪৮ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় ১২৯টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় তাইজ, মারিব, হোদেইদাহ, আল-জাওফ, সাদা, আমরান ও হাজ্জাহ প্রদেশকে লক্ষ্য করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার দাবি, হামলায় এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হয়েছে এবং এগুলো সৌদির খামিস মুশাইত ও তাইফের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করেছে।
তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট আনুষ্ঠানিকভাবে এসব বিমান হামলার দায় স্বীকার করেনি। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিমান সহায়তা দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শুধু বিমান হামলায় হুথিদের থামানো কঠিন
বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-বাশা বলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, সরকারি বাহিনীর বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভক্তি থাকায় হুথিদের পরাজিত করা কঠিন।
তিনি বলেন, সৌদি আরব বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর জন্য চাপের মুখে থাকলেও শুধু বিমান শক্তি দিয়ে হুথিদের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। যুদ্ধের ফল নির্ধারণে স্থলবাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আল-বাশা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে ভবিষ্যতে সৌদি অভিযান হলে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য, জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিক সহায়তা ও সামরিক পরামর্শ দিতে পারে।
তার আশঙ্কা, হুথিরা পুরো ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে এবং সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার বদলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
হুথিদের অগ্রগতিতে ইরানের প্রতিক্রিয়া
হুথিদের হাতে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের নিয়ন্ত্রণ যাওয়াকে ইরানের কর্মকর্তারা স্বাগত জানিয়েছেন। কেউ কেউ মনে করছেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেহরানের কৌশলগত প্রভাব বাড়তে পারে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি হুথিদের অগ্রগতিকে ‘বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও হুথিদের সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছেন।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হুথিদের সাম্প্রতিক সামরিক অগ্রগতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেনি। তেহরানের দাবি, হুথিরা নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত নেয়।
ইরান ইয়েমেনে সৌদি অবরোধ বন্ধ, রিয়াদের সঙ্গে হুথিদের আলোচনা পুনরায় শুরু এবং ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে।
ইয়েমেনের সংঘাতে কারা প্রধান পক্ষ
হুথিরা ২০১৪ সালে ইয়েমেনের বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। কয়েক মাস পর সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে সামরিক হস্তক্ষেপ করে।
ইরান-সমর্থিত হুথিরা এখনো রাজধানী সানাসহ উত্তর ইয়েমেনের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তারা ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হলেও নিজেদের স্বার্থ ও লক্ষ্যও রয়েছে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে। সৌদি আরব এই কাউন্সিলকে সমর্থন দিচ্ছে।
ইসলাহ পার্টিও সরকারি জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দলটির প্রধান ঘাঁটি মারিবে, যা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস ও তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল।
এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা তারেক সালেহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সও সরকারি বাহিনীর সঙ্গে রয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা
ইয়েমেনে নতুন করে শুরু হওয়া এই সংঘাত ২০২২ সালের জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এর আগে প্রায় আট বছর ধরে চলা তীব্র যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষ দ্রুত ভেঙে পড়বে না। বরং সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরতে হতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা
ব্রেকিং