আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:২২, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশাল বালিশে ঘুমিয়ে আছেন এক নারী, চারপাশে নীল রাতের আকাশ। (ছবি/ বিবিসি
খারাপ একটি রাতের ঘুমের পর মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম শরীরের কিছু ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে। তবে নিয়মিত খুব ভোরে ঘুমাতে যাওয়া কিংবা ছুটির দিনে অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে থাকা—দুটিই করতে হবে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে।
আমরা প্রায় সবাই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি—খারাপ ঘুমের পর সকালে ঘুমঘুম চোখে ঘুম থেকে উঠে ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। তখন নিজেদের বলি, ‘সমস্যা নেই, সপ্তাহান্তে ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেব।’
কারও ক্ষেত্রে এটি মাঝে মধ্যে ঘটে, আবার কারও কাছে এটি প্রায় নিয়মিত অভ্যাস। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ হাজার প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ নিয়মিত সপ্তাহান্তে বেশি সময় ঘুমান। আশ্চর্যের বিষয় নয়, বয়সভিত্তিক হিসাবে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই সপ্তাহান্তে বেশি সময় ঘুমানোর প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ছুটির দিনে বেশি ঘুমানোর ইচ্ছা আরও বাড়ে। সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। কিন্তু বাস্তবে সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না।
তাহলে বড় প্রশ্ন হলো—সপ্তাহের দিনগুলোতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কি সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমানো উচিত? আর এভাবে ঘুমের ঘাটতি পূরণ করলে কি কম ঘুমের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব?
বেশি ঘুমানোর ঝুঁকি
সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমানোর নেতিবাচক দিক বুঝতে হলে ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী দুটি প্রধান প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা দরকার।
প্রথমটি হলো স্লিপ হোমিওস্ট্যাট। একে ঘুমের একটি ‘ট্যাংক’ হিসেবে ভাবা যায়। আমরা যত বেশি সময় জেগে থাকি, ততই এতে ঘুমের চাপ জমতে থাকে। ফলে আমাদের ঘুমানোর প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে।
দ্বিতীয়টি হলো সার্কাডিয়ান রিদম বা দেহঘড়ি। প্রতিদিন আলো-অন্ধকারের সংস্পর্শ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, খাবার খাওয়া এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের সময়ের মতো বিষয়গুলো আমাদের দেহঘড়িকে প্রভাবিত করে।
এই দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে আমাদের উপযুক্ত সময়ে ঘুম পেতে সাহায্য করে।
কিন্তু ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে অতিরিক্ত ঘুমালে স্লিপ হোমিওস্ট্যাট এবং দেহঘড়ি—দুটিই কিছুটা ছন্দ হারাতে পারে। সকালে বেশি ঘুমালে দিনের পরের দিকে ঘুমের চাপ কমে যায়। ফলে রাতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় পরে ঘুম পেতে পারে।
শুধু ঘুমের সময় নয়, অতিরিক্ত ঘুমের কারণে আলোতে থাকা, খাওয়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের সময়ও বদলে যায়। এতে সার্কাডিয়ান রিদমেও প্রভাব পড়তে পারে।
ফলে রবিবার সকালে বেশি ঘুমানোর পর রাতে দেরিতে ঘুম আসতে পারে। এরপর সোমবার সকাল ৬টায় অ্যালার্ম বাজার সময় পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ায় আবার ঘুমের ঘাটতি তৈরি হয়।
অরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্লিপ ল্যাবের পরিচালক ও ঘুমবিষয়ক মনোবিজ্ঞানী মেলিন্ডা ক্যাসেমেন্টের ভাষায়, বিষয়টি অনেকটা প্রতি সপ্তাহে টাইম জোন পরিবর্তন করার মতো।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ঘুম পুষিয়ে নেওয়া সবসময় খারাপ। কিছু পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত বিশ্রাম উপকারীও হতে পারে।
ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার উপকারিতা
কম ঘুম আমাদের স্বাস্থ্য ও চিন্তাশক্তিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। তবে নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, বিশেষভাবে খারাপ একটি রাতের ঘুম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। আর কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুম এসব প্রভাব কমাতে বা আংশিকভাবে ফিরিয়ে আনতে পারে।
এক গবেষণায় দেখা যায়, এক রাত মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমানো মানুষের শরীরে দুই ধরনের শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা বেড়ে যায়। এটি শরীরে শারীরবৃত্তীয় চাপের প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
পরের রাতে কিছু অংশগ্রহণকারীকে আট ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও তাদের শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অন্যদিকে, যাদের পরের রাতে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তাদের মাত্রা প্রায় আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
আরেকটি পরীক্ষায় স্বাভাবিকভাবে প্রতি রাতে আট ঘণ্টা ঘুমানো ১১ জন পুরুষকে টানা ছয় রাত মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাতে দেওয়া হয়। এতে তাদের শরীরে গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ও ইনসুলিনের প্রতিক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দীর্ঘদিন এ ধরনের পরিবর্তন চলতে থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে এরপর টানা ছয় রাত ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমানোর সুযোগ দেওয়ার পর তাদের শারীরবৃত্তীয় পরিমাপগুলো আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে।
অন্য গবেষণাগুলোতেও দেখা গেছে, সারারাত না ঘুমানোর পর অতিরিক্ত ঘুম জ্ঞানীয় সক্ষমতা বা চিন্তা ও কাজ করার দক্ষতা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে।
তবে এর মানে এই নয় যে সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমালেই দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতির সব ক্ষতি দূর হয়ে যাবে। কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত কম ঘুমালে বিশেষ করে মনোযোগ ধরে রাখা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানো এবং স্থানিক দিকনির্ণয়ের ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সপ্তাহান্তের অতিরিক্ত ঘুমও পুরো ক্ষতি পূরণ করতে পারে না।
ঘুমের ঘাটতি পূরণে দিনের বেলার ছোট ঘুম বা ন্যাপও উপকারী হতে পারে। তবে এগুলো সাধারণত রাতের ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার গবেষণা থেকে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়।
ঘুম পুষিয়ে নেওয়া কি জীবন বাঁচাতে পারে?
এসব গবেষণা মূলত নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষাগারে করা হয়েছিল। বাস্তব জীবনে কী ঘটে?
একটি সুইডিশ গবেষণায় ৪০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ককে ১৩ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে যারা নিয়মিত রাতে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল।
অন্যদিকে, যারা পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ছিল ৬৫ শতাংশ বেশি।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পাওয়া যায়। সপ্তাহান্তে ভালোভাবে ঘুমিয়ে যারা ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতেন, পাঁচ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমানো ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মৃত্যুঝুঁকি পরিসংখ্যানগতভাবে আর দেখা যায়নি।
আরেক গবেষণায় প্রায় ২ হাজার ৮০০ দক্ষিণ কোরীয় প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে দেখা যায়, নিয়মিত কম ঘুমানো ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি। তবে সপ্তাহান্তে প্রতি অতিরিক্ত এক ঘণ্টা ঘুমের সঙ্গে এই ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহের দিনগুলোতে কম ঘুমানো কিন্তু সপ্তাহান্তে ঘুম পুষিয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কম হতে পারে। তাদের মেটাবলিক সিনড্রোমের ঝুঁকিও কম দেখা গেছে। মেটাবলিক সিনড্রোম এমন কিছু শারীরিক সমস্যার সমষ্টি, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে সব গবেষণায় সপ্তাহান্তে ঘুম পুষিয়ে নেওয়ার সুফল পাওয়া যায়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি বড় গবেষণায় অতিরিক্ত সপ্তাহান্তের ঘুমের সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বা হৃদ্রোগের কোনো স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমানোর কারণে অতিরিক্ত ঝুঁকিও পাওয়া যায়নি।
তাহলে কতটা অতিরিক্ত ঘুম ভালো?
গবেষণায় ক্রমেই এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম একটি ভালো ভারসাম্য হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণায় এই পরিমাণ অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে বিষণ্নতার কম ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নিয়মিত কম ঘুমানো প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এটি শরীরের প্রদাহও কমানোর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তরুণদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে—অতিরিক্ত ঘুমের সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, ছুটির দিনে একটু বেশি ঘুমানো কখনও কখনও ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারে। তবে এর জন্য দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা সম্ভবত প্রয়োজন নেই।
সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা। আর কোনো দিন ঘুমের ঘাটতি হলে পরদিন বা সপ্তাহান্তে এক থেকে দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
সূত্র: বিবিসি
ব্রেকিং